অন্যদৃষ্টি
জাল টাকার আসল সমাধান
খন্দকার এমদাদুল হক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা যারা ব্যাংকিং সেক্টরে আছি, জানি জাল টাকা নিয়ে আমাদের কতটা সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে যারা সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে নগদ লেনদেন কাজে নিয়োজিত, তাদের কিন্তু প্রতিটি টাকা যাচাই-বাছাই করে নিতে হয়। গ্রাহকও যাতে জাল নোট সহজে শনাক্ত করতে পারেন, তার জন্য ব্যাংকের শাখাগুলোয় প্রকৃত নোট চেনানোর প্রচার-প্রচারণামূলক নানা পোস্টার থাকে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাংকের সুনাম ধরে রাখার ব্যাপারও জড়িত। কারণ কোনো গ্রাহক যদি কোনো শাখা থেকে জাল টাকা পান, তাহলে তিনি অবশ্যই নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন। এমনকি ব্যাংকের জন্য আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিও থাকে। জাল টাকা বহন বা লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে একই ঝুঁকিতে থাকেন গ্রাহক।
জাল টাকা প্রতিরোধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও নানাভাবে সক্রিয় দেখি। তারা প্রায়ই অভিযান চালান। বিগত বছরে ওয়ারীতে অভিযান চালিয়ে ৩৮ লাখ জাল টাকা উদ্ধার করে ডিএমপির ডিবি। এ সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রায় বছরই দেখা যায়, কোরবানির পশুর হাট ঘিরে জাল টাকার চক্র বেশি সক্রিয় থাকে। তাই ঈদের আগে পুলিশ বাহিনীর নানা তৎপরতা চোখে পড়ে। এ সময় টাকা যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সরঞ্জামও ব্যবহার করা হয়, যাতে লেনদেনের ক্ষেত্রে কেউ জাল টাকা গছিয়ে দিতে না পারে।
একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে জাল টাকা-সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৭ হাজারের বেশি। এ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় অপরাধীরা প্রায়ই জামিনে বের হয়ে যায়। বর্তমান সরকার এই চক্রকে কড়া বার্তাই দিতে চায়।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। যেখানে প্রস্তাব করা হয়েছে, কারও কাছে জাল নোট থাকলে শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ৭ বছর।
অন্যদিকে, টাকার নকল প্রতিরোধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকৃত টাকার গায়ে নানা রকম নিরাপত্তামূলক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে। কিন্তু অপরাধীরা জাল নোট এমনভাবে তৈরি করে, যেখানে আসল-নকল আলাদা করাও অনেক সময় দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে যারা ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত তারা অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক তাই ইদানীং নগদ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করছে। এবারের জুলাই মাস থেকে তারা বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে। কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সব ব্যাংক, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) ও লেনদেন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী অপারেটর বা পিএসওদের অবশ্যই এটি ব্যবহার করতে হবে।
জাল নোট নিয়ে আমরা যেমন সবসময় এক ধরনের আতঙ্কে থাকি, ইদানীং ছেঁড়া টাকা নিয়েও আমাদের লেনদেনে আলাদা নজর রাখতে হয়। কারণ জোড়াতালি দেওয়া নোট দিয়ে লেনদেনও বিড়ম্বনার বিষয়। এ ক্ষেত্রে ময়লা টাকা ডেকে আনতে পারে আরেক ধরনের বিপদ। সেটি হচ্ছে এগুলোতে লেগে থাকা জীবাণু। দেশ-বিদেশের নানান গবেষণায় দেখা গেছে, কাগুজে নোটে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের উপস্থিতি থাকতে পারে। মানুষের হাত থেকে হাতে ঘুরে জমতে পারে জীবাণু।
তবে ময়লা নোট ধরার কাজটি বাদ দিতে হলে ক্যাশলেস লেনদেন সবচেয়ে ভালো উপায়। আবার কাগুজে নোট চুরি, ছিনতাই হওয়ার যে ঝুঁকি, সেটিও কমে যাবে।
টাকা আসল, নাকি জাল– আপনার সেই টেনশন সহজে দূর করবে প্লাস্টিক মানি। তবে নোটের হোক কিংবা ভার্চুয়াল হোক; লেনদেনে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। কারণ প্রতারকরাও ফাঁদে ফেলতে নানা মাধ্যমে সক্রিয়। তাদের প্রতিরোধে শক্ত আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সতর্ক থাকাও জরুরি।
খন্দকার এমদাদুল হক: ব্যাংকার
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি