ইয়ামালের শুরু
লামিনে ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলের এক তেজদীপ্ত সূর্য
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
একদিকে অস্তায়ন, অন্যদিকে উদয়; পৃথিবীর এই অমোঘ নিয়ম জীবনেও পরাবাস্তব। লিওনেল মেসি তা ভালো করেই বুঝতে পারছেন। শেষের ডাক শুনতে পাচ্ছেন তিনি। আর লামিনে ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলের তেজদীপ্ত সূর্য। যিনি দৃপ্ত পদক্ষেপে ছুটছেন নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো করে বলা যায়– এসেছে নতুন শিশু; তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান। ২০০৭ সালে যে শিশুকে প্লাস্টিকের বাথটাবে গোসল করালেন, ২০২৬ সালে বিশ্বকাপজয়ী ইয়ামালের কাছে তুলে দিলেন প্রতীকী তারকা খ্যাতির ব্যাটন। নাজারিও রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, জিনেদিন জিদানরা একদিন তো লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হাতেও তুলে দিয়েছিলেন আলোর মশাল।
এক জায়গায় মেসি-ইয়ামালের খুব মিল। দুজনেই বার্সেলোনার একাডেমি থেকে উঠে আসা। বার্সেলোনা-প্রেমে দুজনেই অনন্য। রোববারের ফাইনাল শেষে তাদের আলিঙ্গন ক্লাব-প্রেমকে মনে করিয়ে দেয়। এই সম্পর্কের বন্ধনে আরও একটি ঘটনা রয়েছে। ১৮ বছর আগে ইউনিসেফের প্রোগ্রামে শিশু ইয়ামালকে আশীর্বাদ করেছিলেন তিনি। তাই তো স্পেনের কাছে শিরোপা খোয়ানো বাধা হতে পারেনি তাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায়। মেসি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শেষ করেন রানার্সআপ ট্রফি হাতে; ইয়ামালের বিশ্বকাপ অভিষেক শিরোপা জয়ে। তিনি দেশে ফেরেন সোনালি ট্রফি বুকে জড়িয়ে। ১৯ বছরের তরুণকে দুহাত ভরিয়ে দিয়েছেন ঈশ্বর। তিনি চেয়েছিলেন, পেলের পরে কনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ জিততে। রোববার স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে পূরণ হয়েছে সে চাওয়া। সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডের খেরোখাতায় ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পেকে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে ফুটবলের রাজা পেলের পরের নাম লেখালেন স্পেন তারকা।
ইয়ামালের শুরুর বিশ্বকাপ যে মেসির শেষ, তা অনুমেয়। কারণ, ২০৩০ সালে ফিফার শতবর্ষী বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন মহাতারকার বয়স হবে ৪৩ বছর। ওই বয়সে বিশ্বকাপ দূরে থাক, জাতীয় দলে খেলাই অসম্ভব। সেখানে ইয়ামাল ৩৯ বছর বয়সে পৌঁছাতে আর পাঁচটি বিশ্বকাপ পাবেন সামনে। নিজেকে ধরে রেখে তারকা খ্যাতি হজম করতে পারলে মেসির উচ্চতায় পৌঁছাতেও পারেন তিনি। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে শিষ্যের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, ‘সে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরও পরিণত হতে সাহায্য করবে। সে এখন যা আছে, তার চেয়েও বড় ফুটবলার হতে সাহায্য করবে এই অভিজ্ঞতা।’
বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকে বাজিমাত করেছেন স্প্যানিশ রাইট উইঙ্গার ইয়ামাল। জাতীয় দলে খেলার দিন থেকে জানান দেন প্রতিভার। এক বছরের মধ্যেই বিশ্বের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন সম্ভাবনাময় হিসেবে। ২০২৪ সালে ইউরো ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয়ের ম্যাচে ছিলেন দারুণ। টুর্নামেন্টজুড়েই নিজের সক্ষমতা দেখিয়েছিলেন লাল জার্সিতে। এই বিশ্বকাপে ভিন্ন আটটি দলের বিপক্ষে খেলা ম্যাচে একমুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েননি ইয়ামাল। লড়াই করার মানসিকতা দিয়ে জেতেন সতীর্থদের হৃদয়। ফাইনালের আগে স্পেন অধিনায়ক রদ্রি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ইয়ামালকে। অধিনায়কের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বড় তারকার মতোই মেজাজ ধরে রেখেছিলেন ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। রাইট উইং দিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণ তছনছ করেছেন বহুবার। তবে গোল না পাওয়ায় ইয়ামালের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে একটি মাত্র গোল সৌদি আরবের বিপক্ষে। একটিও অ্যাসিস্ট নেই নামের পাশে। এই পারফরম্যান্স দেখার পর সাধারণের দৃষ্টিতে সাধারণ ফুটবলার তিনি। কিন্তু কোচ লা ফুয়েন্তে শিষ্যের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বুঝিয়ে দিলেন, স্পেনের জন্য কতটা সে। এ থেকেই বোঝা যায়, কতটা প্রভাববিস্তারী একজন খেলোয়াড় ইয়ামাল। রোববারের ফাইনালে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পুরো সময় কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিলেন স্প্যানিশ তারকাকে। আঘাতের পর আঘাত দিয়েও টলাতে পারেননি তাঁকে।
এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের আগে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের কাছে ইয়ামাল সম্পর্কে জনতে চাওয়া হলে মন খুলে প্রশংসা করেন। খেলার মাঠে দুজনের দেখাদেখি না হলেও প্রতিভা চিনতে ভুল হয়নি মেসির। শনিবার মেসি বলেছিলেন, ‘আমি ইয়ামালের সাফল্য কামনা করি। সে অমিত সম্ভাবনার সামনে। তবে আমি চাই, এবার সে না জিতুক। আমরা চেষ্টা করব বিশ্বকাপ জিততে।’ ইয়ামালের প্রতি-উত্তরটা ফাইনালের মাঠেই মিলেছে। গুরু মারা বিদ্যা মেসির এফসি বার্সেলোনা থেকেই শিখেছেন ইয়ামাল। স্প্যানিশ তরুণ তুর্কি দেশের হয়ে ২৮ ম্যাচে অপরাজিত। তিনি দুটি বড় টুর্নামেন্টে ১৩ ম্যাচের প্রথম একাদশে ছিলেন। জিতেছেন সবকটিতে। ইয়ামালের সাফল্য মুগ্ধ করেছে বিশ্বের কোটি ভক্তকে। ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টের মতে, ‘লামিনে ইয়ামাল প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে। সে বিচলিত হয়নি, পিছু হটেনি। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যেখানে তাঁকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করছিল, সে তখন একদম শান্ত ছিল। এটা তাঁর পক্ষ থেকে সত্যিই এক অসাধারণ পারফরম্যান্স।’ তিনি আরও বলেন, ‘লামিনে ইয়ামালের বয়স ১৯ বছর। তাঁর জন্য কী সুন্দর একটি দিন। সে ১৯ বছর বয়সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েছে।’ ইংলিশ সাবেক ফুটবলার মনে করেন, ইয়ামালের সামনে ফুটবলের অবারিত দিগন্ত। যেখানে সোনাফলা পারফরম্যান্স চাষ করার অবারিত সুযোগ তাঁর সামনে।
- বিষয় :
- ফুটবল
- মেসি
- বিশ্বকাপ ফুটবল