নবীন সূর্যের আলোয় বিশ্বজয়ের মহাকাব্য
দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ততক্ষণে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে আর্জেন্টিনার গৌরব আর অহংকারের বিশ্বজয়ী ফুটবল। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে একদিকে আর্জেন্টিনার এক স্বর্ণালি সূর্যের চিরতরে অস্ত যাওয়া, অন্য প্রান্তে বিশ্বজয়ের আঙিনায় একঝাঁক কিশোর জাদুকরের রাজকীয় আবাহন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বাইরে তখন কয়েকশ স্প্যানিশ সমর্থকের বাঁধভাঙা উল্লাস। গান বেঁধেছে তারা তাদের নতুন প্রজন্মের বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারদের নিয়ে। প্রচণ্ড গর্ব তাদের ১৬ বছর বাদে সোনালি ট্রফি ফিরে পাওয়ার। লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই স্পেন দলটা আসলে শুধুই ফুটবল টিম নয়; এরা যেন জরাজীর্ণ বিশ্বফুটবলের বুক চিরে আছড়ে পড়া একপশলা অবাধ্য, উন্মাতাল কালবৈশাখী। জাভি-ইনিয়েস্তাদের সেই পুরোনো ‘তিকিতাকা’র ধীরস্থির ঘরানার ওপর দাঁড়িয়েও ফুয়েন্তের এই নতুন প্রজন্ম মাঠে মিলিয়েছে তারুণ্যের অবিশ্বাস্য গতি আর মরণজয়ী জেদ। যে কৌশলের নিখুঁত মহড়ায় স্প্যানিশ মিডফিল্ডের অতন্দ্র প্রহরী রদ্রি একাই বোতলবন্দি করে রাখলেন লিওনেল মেসিকে। ‘আমি কখনোই এমন কিছুর কথা ভাবিনি। এই অসাধারণ খেলোয়াড়দের ছাড়া আমি কিছুই অর্জন করতে পারতাম না। এই প্রতিভা এবং স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের যেভাবে লড়াই করার মানসিকতা– তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। ওরাই এই ইতিহাসের আসল নায়ক।’ ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ইয়ামাল-রদ্রিদের এই প্রজন্মেই যেন কুর্নিশ জানালেন তাদের কোচ ফুয়েন্তে।
জানার প্রবল কৌতূহল ছিল, এমন কী কৌশল তিনি নিয়েছিলেন যে ফাইনালের পুরোটা সময় আর্জেন্টিনাকে তাঁর দল তাড়িয়ে বেড়াল। উত্তরে মাস্টার কোচ ফুয়েন্তে। ‘আমি শুধু ওদের বলেছিলাম– ভদ্রমহোদয়গণ, ইতিহাসের সঙ্গে আজ আমাদের একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট (দেখা করার তারিখ) আছে এবং আমরাই সেখানে সবার আগে পৌঁছাতে চাই।’ ৬৫ বছর বয়সী ফুয়েন্তে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার অনন্য রেকর্ড গড়েও ভীষণভাবে শান্ত। শুধু সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরাই নয়; ব্যক্তিগত সেরার পুরস্কার বিতরণের মঞ্চেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল বিশ্বজয়ী স্পেন। টুর্নামেন্টের শীর্ষ পাঁচটি প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই নিজেদের ঝুলিতে পুরেছেন তারা। আসরজুড়ে মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর রেকর্ডসংখ্যক নিখুঁত পাস দিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ সম্মান ‘গোল্ডেন বল’ নিজের করে নিয়েছেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। অন্যদিকে, পুরো বিশ্বকাপে আট ম্যাচের মধ্যে রেকর্ড সাতটি ক্লিনশিট রেখে এবং টুর্নামেন্টজুড়ে মাত্র একটি গোল হজম করে সেরা গোলরক্ষকের ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জিতেছেন উনাই সিমন। রক্ষণভাগে অপ্রতিরোধ্য প্রাচীর খাড়া করে টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান বা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারটি পকেটে পুরেছেন ১৯ বছর বয়সী রক্ষণ-সেনানী পাউ কুবারসি। এ ছাড়া ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে বদলি নেমে ম্যাচের একমাত্র জয়সূচক মহাকাব্যিক গোলটি করে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) নির্বাচিত হন ফেরান তোরেস। দলগতভাবে প্রায় ৪৮১ কোটি টাকা (৪৪ মিলিয়ন ডলার) প্রাইজমানি জেতার পাশাপাশি এই ব্যক্তিগত অর্জনের ত্রিমুকুট স্পেনের এই কিশোর-তারুণ্যের বিশ্বজয়কে ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য ও রাজকীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
এত অর্জনের পর আর কী-ই বাকি থাকে তাদের সামনে। ‘ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই একঝাঁক খেলোয়াড় আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল– কোচ, সব ক্যাটেগরিতে তো আমরা সবকিছুই জিতে গেলাম। এখন আর জেতার কী বাকি আছে? আমি ওদের বললাম, আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য সেপ্টেম্বরের ম্যাচ। এই দলটা সত্যিই অক্লান্ত ও অবিরাম।’ ঠিক এখানটাতেই এবারের বিশ্বকাপে সব দলকে ছাপিয়ে গেছে স্পেন। ম্যাচের পর ভিভিআইপি দর্শক গ্যালারি থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের ত্রয়ী জাভি-ইনিয়েস্তা-রামোস। তাদের মধ্য থেকে রামোসকে স্প্যানিশ এক গণমাধ্যমের ক্যামেরা ধরে ফেলে কিছু বলার জন্য। ছোট্ট প্রতিক্রিয়ায় রামোস, ‘স্পেনের এই দলটির তারুণ্যের যে গতি, তার সঙ্গে কেউ পেরে ওঠেনি।’ সত্যিই বোধ হয় তাই।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই বিশ্বজয়ী কিশোর সাম্রাজ্য আসলে কোনো আকস্মিক উল্কাপাত নয়; এ হলো এক সুনিপুণ জহুরির এক দশক ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এক আশ্চর্য ফুটবল ল্যাবরেটরি! লামিনে ইয়ামাল, পাউ কুবারসি কিংবা রদ্রিদের পায়ের যে মায়াবী ছন্দ দেখে বিশ্বফুটবল স্তব্ধ, তার বীজ বপন করা হয়েছিল আজ থেকে এক যুগ আগে। ২০১৩ সাল থেকে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ আর অলিম্পিক দলের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ফুয়েন্তে যখন এই ছেলেদের শৈশব আর কৈশোরের হাত ধরেছিলেন, তখন ওরা ছিল স্রেফ কাদামাটির তাল। সেই কাদামাটিকে পরম মমতায় পুড়িয়ে আজকের এই ইস্পাতকঠিন বিশ্বজয়ী ‘লা রোজা’ বানিয়েছেন তিনি। রদ্রি কিংবা ওলমোদের রক্তে ফুয়েন্তের ফুটবল-দর্শন এতটাই মিশে গেছে যে, বয়সভিত্তিক দল থেকে সিনিয়র টিমে আসার পর তাদের বিন্দুমাত্র খাপ খাইয়ে নিতে হয়নি। ফুটবল দুনিয়ার অন্য কোচেরা যখন কোটি ডলারের মহাতারকা কিনতে বাজারে ঘোরেন, ফুয়েন্তে তখন নিজের ঘরের যুব-কারখানা থেকে তুলে আনেন একঝাঁক অপ্রতিরোধ্য কিশোর জাদুকর। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতার জরাগ্রস্ততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফুয়েন্তের এই দীর্ঘমেয়াদি যুব প্রকল্পই প্রমাণ করল– ফুটবলের শেষ কথা পরম স্নেহে গড়ে তোলা তারুণ্যের এক মরণজয়ী স্পন্দন।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- স্পেন
- আর্জেন্টিনা ফুটবল