ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

কিশোরকে নিষ্ঠুর নির্যাতন, নিভছে চোখের আলো

সাভার থানায় মামলা, ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

কিশোরকে নিষ্ঠুর নির্যাতন, নিভছে চোখের আলো
×

ভুক্তভোগী রিপন দাস ও আসামি মাহাবুব হোসেন সামির

সমকাল প্রতিবেদক ও নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার 

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার সাভারের কিশোর রিপন দাস। শীর্ণ শরীর নিয়ে বিছানায় শোয়া। মাথা, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। পরিবার বলছে, তুচ্ছ ঘটনায় তাকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। এখন সে দুই চোখের আলো হারাতে বসেছে। 

এ ঘটনায় রিপনের পরিবারের পক্ষ থেকে সাভার থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার অন্যতম আসামি সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামির (বর্তমানে বহিষ্কৃত)। অন্য আসামিরা হলেন মানিক ওরফে পিস্তল মানিক ও সজীব। এ ছাড়া পাঁচ-ছয়জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ।

রিপনের স্বজন সমকালকে বলেন, জুনিয়র-সিনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে গত ২ মে রিপনকে সাভারের রাজাসন এলাকা থেকে কয়েকজন তুলে মাহবুবের অফিসে নিয়ে যায়। এর পর তার ওপর ভয়ানক নির্যাতন চালান মাহবুবসহ কয়েকজন। 

রিপন ময়মনসিংহের তারাকান্দা এলাকার জীবন ঋষি মনি দাসের ছেলে। সে মা-বাবার সঙ্গে সাভার পৌর এলাকার রাজাসন পালোয়ানপাড়া মহল্লায় ভাড়া বাসায় থাকে। জীবন ঋষি পেশায় চর্মকার। তাঁর স্ত্রী স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। কিশোর রিপন একসময় এম্ব্রয়ডায়েরির কাজ করত। 

মামলার বাদী রিপনের বোন জামাই স্বপন সূত্রধর সমকালকে জানান, গত ৩০ মে বিকেলে সাভারের রাজাসন এলাকায় এক ছেলের সঙ্গে রিপনের ধাক্কা লাগে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে ২ জুন বিকেল ৪টার দিকে কয়েকজন যুবক রিপনকে একা পেয়ে তুলে নিয়ে ছাত্রদল নেতা মাহাবুবের অফিসে যান। সেখানে ঘরের দেয়ালের সঙ্গে মাথায় আঘাত করে ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। রিপন এখন দুই চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে কিনা, বুঝতে পারছেন না। 

রিপনের মা আসন্তী ঋষি বলেন, মারধরের কারণে ছেলের চোখে ও মাথায় সমস্যা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য রিপনকে প্রথমে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায় গত বৃহস্পতিবার তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রিপনের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। অস্ত্রোপচার করাতে হবে। 

মামলার বাদী স্বপন সূত্রধর সমকালকে বলেন, ‘প্রথমে পুলিশ মামলা নিতে চায়নি। অনেক ঘোরাঘুরি করে মামলা করতে পেরেছি। মামলা করার পর বাদশাহসহ কয়েকজন এসে হুমকি দিয়ে গেছে। তারা মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দিচ্ছে। হুমকি দেওয়ার কারণে বাদশাহর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ দিয়েছি। আমরা প্রাণভয়ে আছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ওই ছাত্রদল নেতার মামা আনোয়ার হোসেন গতকাল শনিবার দুপুরে রিপন দাসের রাজাসনের বাসায় গিয়ে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়ে থানা থেকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বলে গেছেন । 

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। 
অন্যদিকে, থানায় মামলা হওয়ার পর গত শুক্রবার রাতে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে মাহাবুব হোসেনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানানো হয়। 

জানতে চাইলে মাহাবুব হোসেন সামির বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই। ঘটনাস্থলে ছিলাম না। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবাল জানিয়েছেন, এক কিশোরকে মারধরের ঘটনায় সাভার মডেল থানায় মামলা হয়েছে। সেই কারণে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁকে বহিষ্কার করেছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×