ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

চীন সফরের বড় প্রাপ্তি রাজনৈতিক আস্থা

চীন সফরের বড় প্রাপ্তি রাজনৈতিক আস্থা
×

মাহফুজুর রহমান

মাহফুজুর রহমান

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:৩৮

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে মানুষের আগ্রহের পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, সফরের আগে সরকারপক্ষ থেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও প্রকল্প সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্প এলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের আয় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে টানাপোড়েনের আলোচনা চলছে, তার মধ্যে চীন সফর বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও মানুষের কৌতূহল ছিল।

আমার কাছে মনে হয়েছে, এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা বা ‘পলিটিক্যাল গুডউইল’ আরও শক্তিশালী হওয়া। ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রকল্প সহায়তা কিংবা বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি হয় এই রাজনৈতিক আস্থার ওপরই।

গত তিন বছরে বাংলাদেশের তিনজন ভিন্ন সরকারপ্রধান চীন সফর করেছেন। এই সময়ের যৌথ ঘোষণাগুলো পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। চীনের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানের সফরকে চীনও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে যেসব বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সেগুলোর বড় অংশে চীনের আগ্রহ রয়েছে। ফলে এসব প্রকল্পের প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার কতটা দৃঢ় থাকবে, সেটি নিশ্চিত করাও বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির আইনসভার প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। এমনকি দুই দেশের রাজনৈতিক দলের মধ্যেও সমঝোতা হয়েছে। এসব ঘটনাই আমার কাছে ইঙ্গিত দেয়, চীনের কাছে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানেই একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও সুস্থ বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে যদি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে তাতে সমস্যা দেখি না। কিন্তু যদি অজান্তেই আমরা ক্রমান্বয়ে চীনের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করে ফেলি, তাহলে সেই বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার।

আমার কাছে এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা প্রতিষ্ঠা। এই আস্থা ভবিষ্যতে প্রকল্প সহায়তা, অর্থায়ন, বিনিয়োগ কিংবা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ওপর।

মিয়ানমার হয়ে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যোগাযোগ বা করিডোর প্রকল্পকে আমি একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় এবং চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি। বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই এ ধরনের সংযোগ উদ্যোগে আগ্রহী। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রস্তাবিত উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরও (বিসিআইএম) সেই চিন্তার অংশ ছিল। কিন্তু করিডোরে সংশ্লিষ্ট অনেক ইস্যুর সীমাবদ্ধতায় তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। তবে এবার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, এই প্রকল্পে মিয়ানমারের ভূমিকা।

আমার সংশয়ের জায়গা হলো, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুব উষ্ণ নয়। অতীতেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করার বিষয়ে দেশটির অনীহা ছিল। আবার যে অঞ্চল দিয়ে এই যোগাযোগ স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি সংঘাতপ্রবণ এবং সেখানে মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণও দুর্বল। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তবুও আমি মনে করি, চীন দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের একটি কার্যকর পথ নিশ্চিত করতে চায়। মিয়ানমারের চাকফিউ বন্দরে তাদের সম্পৃক্ততাও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। যদি ভবিষ্যতে এই করিডোর বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। তাই চ্যালেঞ্জ থাকলেও এটিকেই ইতিবাচক সম্ভাবনা হিসেবে দেখা উচিত।

ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নে আমি বিষয়টিকে সরলভাবে দেখি না। চাপ আসতেই পারে, আবার নাও আসতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা। যেসব দেশ উদ্বিগ্ন হতে পারে, তাদের সঙ্গে কীভাবে আলোচনা হবে, কীভাবে আস্থা তৈরি করা হবে এবং বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটিই মূল বিষয়। বাংলাদেশ যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে এগোচ্ছে, তাই বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে আরও দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করতে হবেই।

মোংলায় ভারতের জন্য নির্ধারিত ইপিজেড প্রকল্প বাতিল হওয়ার বিষয়টিকেও আমি চূড়ান্ত হিসেবে দেখি না। আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, আগের চুক্তি অনুযায়ী কোনো অগ্রগতি হয়নি বলেই সেটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ভারত যদি ভবিষ্যতে আগ্রহ দেখায়, তাহলে নতুন করে আলোচনা ও চুক্তির সুযোগ রয়েছে। একইভাবে যদি চীন দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে এবং তাদের জন্য জমি প্রয়োজন হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ দেওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এর অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনো দেশের জন্য ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ শুরু করার সিদ্ধান্তকে আমি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখি। চীন অনেক আগে থেকেই দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করতে আগ্রহী ছিল। এখন সেই প্রক্রিয়া আরও এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে যেমন কৌশলগত উপাদান রয়েছে, তেমনি চীনের সঙ্গেও সেই মাত্রা যুক্ত হলে বিভিন্ন বৃহৎ শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হতে পারে। তবে সেটিও অবশ্যই বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক সক্ষমতা ও সচেতন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।

যৌথ ঘোষণাগুলোর ভাষা বিশ্লেষণ করলেও একটি ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৪ সালের ঘোষণায় বাংলাদেশ এক চীন নীতিতে সমর্থন জানিয়ে তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ২০২৫ সালে যুক্ত হয়, বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। আর ২০২৬ সালের ঘোষণায় বলা হয়েছে, চীনের পুনঃএকত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে। আমার কাছে এটি দেখায় যে, চীনের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ধাপে ধাপে আরও বাড়ছে।

বাংলাদেশ যদি উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের অংশ হিসেবে সব গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করে, তাহলে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে। আর সেই ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাই আগামী দিনের বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও পড়ুন

×