ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতি

অনিন্দ্য সুগন্ধি শ্বেত চাঁপা

অনিন্দ্য সুগন্ধি শ্বেত চাঁপা
×

চয়ন বিকাশ ভদ্র

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩১ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩২

ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রের তীরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন। পুষ্প, বৃক্ষ, লতাগুল্মে সমৃদ্ধ এই গার্ডেনে মাঝে মাঝে যাই উদ্ভিদ বা ফুলের সন্ধানে। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল গিয়েছিলাম এই গার্ডেনে। বৈশাখের প্রচণ্ড গরম। মূল গেট দিয়ে ঢুকে সোজা এগিয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম। হাতের ডানেই শ্বেত চাঁপা গাছে ফুলের দেখা পেলাম। 

গাছটি খাটো। ডাল কলম বা গুটি কলমের মাধ্যমে এই গাছটির জন্ম– এটা বোঝা গেল। 

শ্বেত চাঁপা একটি হাইব্রিড বা সংকর উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Magnolia alba, এটি Magnoliaceae পরিবারের মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। শ্বেত চাঁপা আমাদের উপমহাদেশের এক অনন্য রূপসী ও সুগন্ধি ফুল। শ্বেত চাঁপা মূলত Magnolia champaca এবং Magnolia montana-এর সংকরায়নের ফলে সৃষ্ট হাইব্রিড জাত। 

এটি একটি হাইব্রিড বা সংকর উদ্ভিদ, তাই এতে কোনো বীজ বা ফল হয় না। ডাল কলম বা গুটি কলমের মাধ্যমেই এর বংশবিস্তার করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন ছাড়াও মহারাজা শশীকান্ত আচার্যের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের শশীলজের সামনে দুদিকে দুটি বিশাল শ্বেত চাঁপা গাছ এবং সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (পুরুষ) ক্যাম্পাসে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সামনে দুদিকে দুটি উঁচু শ্বেত চাঁপা গাছ রয়েছে। 
চিরসবুজ এই বৃক্ষটি তার অনিন্দ্যসুন্দর সাদা ফুল এবং তীব্র, মিষ্টি সুবাসের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাগানের এক কোণে বা আঙিনায় এই গাছটি থাকলে তার রূপ এবং সুবাস সহজেই সবার নজর কাড়ে।

শ্বেত চাঁপা গাছ সোজাভাবে ওপরের দিকে বাড়ে এবং এর ডালপালা বেশ ছড়ানো হয়। গাছটি সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার (৩০ থেকে ৫০ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ড ধূসর-বাদামি এবং মসৃণ প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর পাতাগুলো বেশ বড়, উপবৃত্তাকার বা ল্যান্সের মতো আকৃতির এবং চকচকে সবুজ। পাতার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। পাতার উপরিভাগ মসৃণ হলেও নিচের দিকটা কিছুটা হালকা রঙের হয়।

শ্বেত চাঁপার আসল আকর্ষণ হলো এর ফুল। ফুলগুলো এককভাবে পাতার কক্ষে ফোটে। এর পাপড়িগুলো সাধারণত সংখ্যায় ১০ থেকে ১২টি হয়, যা বেশ লম্বা, সরু এবং কিছুটা বাঁকানো প্রকৃতির। ফুল পুরোপুরি ফোটার আগে দেখতে অনেকটা মোমবাতির শিখার মতো। এর রং ধবধবে সাদা থেকে হালকা ক্রিম রঙের হয়ে থাকে। এই ফুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর তীব্র ও মোহনীয় সুবাস। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এবং ভোরের বাতাসে এই সুগন্ধ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। 

শ্বেত চাঁপা কেবল সৌন্দর্য বা সুবাসের জন্যই নয়, বরং অর্থনৈতিক, ভেষজ এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো বাগান, পার্ক বা বাড়ির আঙিনায় শ্বেত চাঁপা গাছ পরিবেশের সৌন্দর্য বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ঘন সবুজ পাতা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে চমৎকার ছায়া প্রদান করে। এ ছাড়া এই সুগন্ধি ফুল চারপাশের বাতাসকে সতেজ ও মনোরম রাখে, যা মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।

বিশ্বজুড়ে সুগন্ধি বা পারফিউম তৈরিতে শ্বেত চাঁপার ফুলের নির্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী সুবাসের কারণে দামি সুগন্ধি, সাবান, বডি ওয়াশ এবং সুগন্ধি মোমবাতি তৈরিতে এই তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে এই ফুল চাষ করে তেল নিষ্কাশন করা একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। 

ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি, বিশেষ করে আয়ুর্বেদ ও চীনা ওষুধে শ্বেত চাঁপার পাতা, ফুল এবং ছালের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। এর ফুলের সুগন্ধ অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়, যা স্নায়ুকে শান্ত এবং মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। এর ফুল ও পাতার রস কাশি, ব্রঙ্কাইটিস এবং হালকা জ্বর উপশমে ব্যবহার করা হয়। এই বৃক্ষের ছাল ও পাতার নির্যাস ত্বকের প্রদাহ কমাতে এবং ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

আরও পড়ুন

×