ব্র্যাকের সম্মেলনে বক্তারা
গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়ে যায়নি
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৭
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আশাবাদ দ্রুত কমে গেছে। তবে এই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের ধারাবাহিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় থাকলে নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও উদার গণতান্ত্রিক পরিসর গড়ে তোলা এখনও সম্ভব।
সোমবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক দিনব্যাপী সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। সম্মেলনের এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন: ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা ও শিক্ষা’।
সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন। মূল বক্তব্য দেন সংস্থার গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিক্স ক্লাস্টারের অ্যাডভাইজার ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মির্জা এম. হাসান। এরপর তিনটি বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনে নাগরিক সমাজ ও নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতিনিধিরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তিত ভূমিকা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন ও প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও অল্টারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম, রাজনীতিক ও চিকিৎসক তাসনিম জারা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুবাইয়া মুর্শেদ, গবেষক ও লেখক সোহুল আহমেদ, অল্টারনেটিভসের সংগঠক ডা. তাজনূভা জাবীন, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অনিক রায়, পিপলস রেভল্যুশনারি ইনিশিয়েটিভের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক এ কে এম ফাহিম মাশরুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক ড. সেউতি সবুর।
ড. ইমরান মতিন বলেন, গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি চলমান প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র মূলত একটি নকশা। প্রতিটি সমাজকেই প্রয়োজনে গণতন্ত্রকে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্কল্পনা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। ড. মির্জা এম হাসান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল একটি ব্যতিক্রমী গণঅভ্যুত্থান। এটি মূলত জনগণের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর খুব বেশি নির্ভরশীলও ছিল না।
জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহফুজ আলম বলেন, আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রচলিত বাম-ডান রাজনীতির বাইরে নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আদর্শগত মতভেদের কারণে দলে যে বিভাজন তৈরি হবে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোও সেই মতভেদ কাজে লাগিয়েছে। তাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকতে হলে নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং তা ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় নারীদের বিষয়গুলো শুধু নারী শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। আবার নারী শাখার মধ্যেও নারীদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো হয়।
ড. রুবাইয়া মুর্শেদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ইতিহাসের নানা উদাহরণ ব্যবহার করে যেভাবে আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরা হয়েছে, তা আশার কথা। এখন প্রয়োজন, শিক্ষা কীভাবে মানুষকে আরও সচেতন ও নাগরিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া।
সোহুল আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বড় বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে এসেছে। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আন্দোলন হলে অনেকেই তা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না।
ডা. তাজনূভা জাবীন বলেন, ‘অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে, অধিকারভিত্তিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার অধিকার শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়।’
অনিক রায় বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে আপনি বাম না ডান–সেটি আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি কতটা জবাবদিহিমূলক, নিজের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করেন।’
আরিফ সোহেল বলেন, এতদিন আমরা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বলতে মূলত ভোটাধিকারকেই বুঝেছি। কিন্তু এখন গণতন্ত্রকে দেখার সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রচলিত বাম-ডান বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষকে সংগঠিত করার নতুন পথ নিয়ে ভাবতে হবে।
সম্মেলনে আলাদা আলাদা গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন মুগ্ধ মাহজাব, অধ্যাপক ড. শুভাশীষ বড়ুয়া, নাজমুল আহসান, আকিব মো. শাতিল, তাহরিমা বিনতে তারিক, ইয়াসিন শাফি, ড. সোহেলা নাজনীন, মাহীন সুলতান, অধ্যাপক ড. মারুফা আক্তার, সৈয়দা সেলিনা আজিজ, ইনতেমাম আহসান এবং রাগিব আনজুম। এতে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাভিত্তিক প্রতিবেদন ‘গণতন্ত্রের ভাঙন, সংস্কার ও পুনর্কল্পনা: উত্তরণ-পর্বের যন্ত্রণাময় যাত্রাপথ’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
- বিষয় :
- ব্র্যাক