ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

রাশিয়া-জার্মানি কি হাইব্রিড যুদ্ধে জড়িয়েছে?

রাশিয়া-জার্মানি কি হাইব্রিড যুদ্ধে জড়িয়েছে?
×

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৩৭ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৪৫

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানি সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলেছে। এরপর একটি প্রশ্নও সামনে আসছে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ মেনে এবার কি সামরিক জোটটির সদস্যরা মস্কোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে?

এই প্রশ্ন ওঠার কারণ অনুচ্ছেদ-৫ এর একটি ধারা। যেখানে বলা হয়েছে, ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশ হামলার শিকার হলে তা বাকিদের ওপর আক্রমণ হিসেবেও গণ্য হবে। জবাব দিতে তারা সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে।

জার্মানির অভিযোগ, গত ৪ আগস্ট তাদের লিপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ তদন্তের পর সম্প্রতি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এর জন্য মস্কোকে দায়ী করেছে। একইসঙ্গে কিছু পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। মস্কোও সেগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিকে আপাতত ‘নতুন উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করছে ইউরোপীয় গণমাধ্যমগুলো। তবে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট এক্ষেত্রে একটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রতিদিনই হাইব্রিড যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছি।’

তাই নতুন প্রশ্ন উঠছে, রাশিয়া ও জার্মানি কি হাইব্রিড যুদ্ধে জড়িয়েছে? 

হাইব্রিড যুদ্ধ কী?
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষণের প্ল্যাটফর্ম গ্লোবাল সিকিউরিটি রিভিউ। তারা বলছে, হাইব্রিড যুদ্ধ বলতে প্রচলিত ও অপ্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয়কে বোঝায়। এর মধ্যে সামরিক অভিযান, সাইবার যুদ্ধ, অপতথ্য ছড়ানোর প্রচার এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মতো কর্মকাণ্ড আছে।

বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাই ভারহোফস্টাড তাঁর এক মতামত নিবন্ধে হাইব্রিড যুদ্ধের উদাহরণ হিসেবে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অলাভজনক মিডিয়া সংস্থা প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে নিবন্ধটি প্রকাশ হয় নির্বাচনে প্রায় এক মাস পর।

এফবিআই ও সিআইয়ের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে গাই ভারহোফস্টাড লিখেছিলেন, ওই নির্বাচনের হাওয়া ট্রাম্পের পক্ষে রাখতে রাশিয়া যেমন হ্যাকিং করেছে, তেমনি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। তবে হাইব্রিড যুদ্ধে সাইবার হামলা একটি অংশ মাত্র। এর মধ্যে আরও আছে- উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী সংগঠন ও জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনগুলোকে সহায়তা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার চালানো।

ন্যাটোর ওয়েবসাইটেও বলা হয়েছে, হাইব্রিড কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু, জনমতকে প্রভাবিত এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা দুর্বল করা। 

রাশিয়া-জার্মানির মধ্যে যা ঘটছে
যে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার কথা বলা হচ্ছে সেটি ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। সেখানে ইউক্রেনের আন্তোনভ পরিবহন বিমান নিয়মিত চলাচল করে। অ্যান্তোনভ কিয়েভের একটি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। দেশটির সঙ্গে রাশিয়া সামরিক যুদ্ধে লিপ্ত। 

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে প্রথমে একটি ড্রোন রোবটের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, আরেকটি ড্রোন পরিবহন বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এ ঘটনার ১০ দিন পর বিমানবন্দরটিতে তৃতীয় ড্রোনের উপস্থিতি দেখা যায়। 

এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানি মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে চাইছে। এর মধ্যে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে রুশ নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে বার্লিনে অবস্থিত রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘রাশিয়ান হাউস’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে, এই কেন্দ্রের মাধ্যমে মস্কো তাদের প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। এছাড়া, বনে অবস্থিত রুশ কনস্যুলেটও বন্ধ করা হয়েছে। 

জার্মানির এসব উদ্যোগকে ‘রাশিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে মস্কো। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তারা বৃহস্পতিবার জার্মানির গ্যেটে ইনস্টিটিউটের একাধিক শাখা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ভাষা শেখার এই ইনস্টিটিউট পরিচালিত হয় জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে।

এছাড়া, গোপনে রাশিয়ার পণ্যবাহী জাহাজকে বাধা দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বার্লিন। পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে, কথিত ড্রোন হামলার উত্তেজনা দেশ দুটিকে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আটকে দেওয়ার মতো লড়াইয়ে নামিয়েছে। 

এটি কি হাইব্রিড যুদ্ধ?
ড্রোন হামলার ঘটনার পর খোদ জার্মানির ভেতরই প্রশ্ন উঠেছে, দেশ যুদ্ধাবস্থায় আছে কি না? এ নিয়ে গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডয়চে ভেলে লিখেছে, আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে জার্মানি এখনো রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত নয়। 

কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, স্বীকৃত কোনো সশস্ত্র সংঘাত নেই এবং ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সক্রিয় করা হয়নি। এছাড়া যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার আগে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অনুচ্ছেদ ৪ অনুযায়ী পরামর্শ করতে হয়। সেই পরামর্শেরও কোনো সময় নির্ধারণ করা হয়নি।

তবে হাইব্রিড যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ, এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, রাশিয়া এরই মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে এ ধরনের হাইব্রিড যুদ্ধ চালাচ্ছে। এর মধ্যে অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার হামলা, অপতথ্য ছড়ানো এবং প্রচলিত গুপ্তচরবৃত্তির মতো কর্মকাণ্ড আছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যেসব পশ্চিমা দেশ কিয়েভকে সমর্থন দিচ্ছে তাদের মধ্যে জার্মানি অন্যতম। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি বলেছেন, ড্রোন বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আকাশসীমা লঙ্ঘন করাটাও হাইব্রিড যুদ্ধ।

তাহলে জার্মানি কি হাইব্রিড যুদ্ধে আছে? বার্লিন আপাতত এর কোনো সরাসরি উত্তর দেয়নি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডিকে বলেছেন, যুদ্ধে না থাকলেও তারা রাশিয়ার ‘যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু’তে পরিণত হয়েছেন।

বার্লিনের ‘প্রমাণ’ ও মস্কোর প্রতিক্রিয়া
গত জুলাইয়ে নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে পোল্যান্ডের গণমাধ্যম ওনেট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেটি ছিল ন্যাটোর সদস্যদের ওপর রাশিয়ার সম্ভাব্য নতুন হামলার ধরন নিয়ে। 

গণমাধ্যমটিকে নিরাপত্তা সূত্র বলেছিল, চরম পরিস্থিতিতে দেশগুলোর সীমান্ত অঞ্চলে ‘হাইব্রিড হামলা’ হতে পারে। উসকানিমূলক পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ড্রোন হামলা অথবা বিমান হামলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

একই মাসের শেষ দিকে পোল্যান্ডের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ঘটনাস্থলটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। যে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হেনেছে সেটি সম্ভবত রাশিয়ার কেএইচ-১০১ ক্ষেপণাস্ত্র।

লিপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা নিয়ে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বলেছেন, ড্রোনটির কাঠামো, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক এবং ডেটোনেটর- সবকিছুই রাশিয়ার ‘হাইব্রিড অপারেশনের’ সঙ্গে মিল আছে।

এই নমুনাগুলোকে বার্লিন প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘কোনো প্রমাণ নেই। যা দেখানো হচ্ছে সেগুলো সাজানো।’ আরটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পুতিন বলেন, বার্লিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে এসব অভিযোগের সূত্রপাত। 

এখন কেন এই উত্তেজনা?
জার্মানিতে বর্তমানে আঞ্চলিক নির্বাচনের আমেজ চলছে। যে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার কথা বলা হচ্ছে সেটি স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে। আগামী রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সেখানে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা। তবে এর আগেই বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, সরকার গঠনের পথে আছে কট্টর ডানপন্থি দল এএফডি। 

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএফডি যদি সত্যিই জয়ী হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জার্মানিতে প্রথমবারের মতো কট্টর ডানপন্থিরা আঞ্চলিক সরকার গঠন করবে। যা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

আঞ্চলিক নির্বাচনে এমন পূর্বাভাসের মধ্যেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলল ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের নেতৃত্বাধীন সিডিইউ-সিএসইউ ও এসপিডির জোট সরকার। কিন্তু এর সঙ্গে নির্বাচনের যোগসূত্রতার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। 

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতির মধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর জনসমর্থন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। এখন তিনি মানুষের সামনে ‘আগ্রাসী রাশিয়ার’ কথিত হুমকিকে তুলে ধরছেন।

নতুন উত্তেজনার মধ্যে জার্মানির চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। আগস্টের শেষ দিকে লিপজিগের ঘটনাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন, ‘হাইব্রিড হামলার জন্য দায়ীদের চড়া মূল্য দিতে হবে।’

জার্মানির প্রতি সংহতি জানিয়ে সম্প্রতি একই সতর্কবার্তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন বলেছেন, ‘আমাদেরকে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। এর অর্থ হলো, রাশিয়ার বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের জবাব দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট খবর

আরও পড়ুন

×