পুলিশের পদায়নে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ, তৈরি হচ্ছে ফিটলিস্ট
এসপি থেকে তদূর্ধ্ব ও পরিদর্শক পদের যোগ্য কর্মকর্তা বাছাই হবে ২০০ নম্বরের ভিত্তিতে
পুলিশের লোগো। ফাইল ছবি
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পদায়নের ক্ষেত্রে ‘সৎ, যোগ্য, দক্ষ’ কর্মকর্তা যাচাই করতে বাছাই তালিকা (ফিটলিস্ট) তৈরির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে পুলিশ বাহিনী। অনেক দিন ধরে বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও প্রথমবারের মতো এ লক্ষ্যে দুটি কমিটি গঠন করছে পুলিশ।
সুনির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে পুলিশ সুপার (এসপি) থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের যাচাই করবে ছয় সদস্যদের একটি কমিটি। আরেকটি কমিটি পরিদর্শক বা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পদের সদস্যদের ফিটলিস্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। দুটি কমিটির প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত আইজিপি। যাচাই প্রক্রিয়ার কাঠামো চূড়ান্ত করতে সম্প্রতি একাধিক বৈঠকও হয়েছে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রটি বলছে, দুই ধাপে ফিটলিস্ট চূড়ান্ত হলে এই তালিকার যারা থাকবেন, তারা পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। পুলিশ সুপার, অফিসার ইনচার্জ, ডিআইজিসহ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের জন্য আগে থেকে ফিটলিস্টে থাকতে হবে ওই কর্মকর্তাকে। বেশ কিছু মানদণ্ডের নিরিখে ২০০ নম্বরের ভিত্তিতে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের যাচাই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছিল।
পুলিশের কিছু সদস্যের বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। ফিটলিস্ট না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের নাম বাছাই করা হয়। এটিকে কেউ বলেন–‘চুজ অ্যান্ড পিক’। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ও নির্দিষ্ট এলাকার লোকজন পদায়নের জন্য প্রাধান্য পাওয়ার নজির অনেক পুরোনো। বাহিনীর ভেতরে কিছু যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে যোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা থাকলে পদায়নের মানদণ্ড হিসেবে তা বিবেচিত হবে। আবার বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও একটি বার্তা যাবে– ফিটলিস্টে থাকতে চাইলে তাঁকে কিছু নিয়মনীতির মধ্যে চলতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লটারির মাধ্যমে এসপি এবং ওসির পদায়ন করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গুরুত্ব বিবেচনা করে ৬৪ জেলাকে এ, বি, সি– এমন তিনটি ভাগ করা হয়।
একইভাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় তিনটি ‘পুলে’ তাদের নাম রাখা হয়েছিল। ‘এ’ ক্যাটেগরির জেলায় পুল থেকে ‘এ’ ক্যাটেগরির কর্মকর্তাদের পদায়ন বিবেচনা করা হয়। ‘বি’ ক্যাটেগরির জেলায় পুলের ‘বি’ এবং ‘সি’ ক্যাটেগরির জেলায় ‘সি’ ক্যাটেগরির কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়। তবে লটারির মাধ্যমে এসপি এবং ওসি পদায়নের এই প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকে প্রশ্ন উঠেছিল। লটারিতে জেলা ও থানায় এমন অনেক কর্মকর্তার পদায়ন হয়েছিল; যারা সেখানে কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর দেখাতে ব্যর্থ হন। এর প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। এরপর লটারির মাধ্যমে পদায়নের ব্যবস্থা থেকে সরে আসেন নীতিনির্ধারকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের কয়েকটি জেলার এসপিসহ আরও কিছু পদে কর্মকর্তাদের পদায়নের পর তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর একাধিক এসপির পদায়ন বাতিল করা হয়। কয়েকজনকে সংযুক্ত করে রাখা হয়। এখন থেকে পদায়নের আগে আরও যাচাই-বাছাই করতে চান নীতিনির্ধারকরা; যাতে পদায়নের ক্ষেত্রে বিতর্ক এড়ানো যায়। কয়েক ধাপ যাচাইয়ের পর পদায়ন করা হলে যাতে ওই কর্মকর্তাকে মাঠ থেকে তুলে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়। যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোনো কর্মকর্তার পদায়ন হলে তাঁকে ঘিরেও বিতর্ক হলে নীতিনির্ধারকরা তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে চান না।
ডিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রশাসনের ফিটলিস্টে থাকা কর্মকর্তাদের মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে। যোগ্য কর্মকর্তাকে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া হয় বিভিন্ন জেলায়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার এক বছর পর ডিসি পদে পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট তৈরি করা হয়। পুলিশের ফিটলিস্ট তৈরিতে প্রতিবছরের কাজের মূলায়ন প্রতিবেদন, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতার বিষয় মূল্যায়ন করা হবে।
পুলিশের সাবেক ও বর্তমান অনেক কর্মকর্তা বলছেন, অনেক সময় নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন ঘিরে কোনো সুবিধাভোগী চক্র জড়িত হওয়ার চেষ্টা করে। আবার নিয়োগ পদায়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারের অবৈধ আদেশ পালন করে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। তাই পুলিশকে জবাবদিহির পাশাপাশি ‘কার্যকর স্বাধীনভাবে’ কাজ করার পরিবেশ তৈরি করার বিষয়টি নিয়েও অনেক দিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।