ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

স্থানীয় সরকার নির্বাচন

পোস্টার বাদ ও বিলবোর্ডের সীমা বেঁধে দিয়ে আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত

পোস্টার বাদ ও বিলবোর্ডের সীমা বেঁধে দিয়ে আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত
×

ফাইল ছবি

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:১২

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের ভোটের প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধ থাকছে। এর বদলে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। তবে বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত সংখ্যায় করতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের খরচকে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার ঠেকাতেও নানা বিধান রাখা হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনি আচরণ বিধিমালায়। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা অপব্যবহারমূলক তথ্য ও কন্টেন্ট প্রচার করা যাবে না।

এসব বিধান রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণ বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একইসঙ্গে তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ইসি। স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের জন্য আলাদা আলাদা নতুন আচরণ বিধিমালার খসড়া তৈরি করেছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।

এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আচরণ বিধিমালাগুলোর খসড়া প্রণয়ন করে ইসি। সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রণীত স্থানীয় সরকার নির্বাচনি আচরণ বিধিমালায় সংস্কার ও রদবদল করে এসব খসড়া তৈরি করা হয়। পরে খসড়াগুলোর বিষয়ে অংশীজনের মতামত চেয়ে এগুলো নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। একইসঙ্গে ইসির নিবন্ধিত ৫৯টি দলের কাছেও ই-মেইলে খসড়া পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হয়। ইসির বেঁধে দেওয়া সময়সীমা গত ৩০ জুনের মধ্যে নয়টি রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির পক্ষে লিখিত মতামত পাঠানো হয়। এসব মতামত পর্যালোচনার পর দুই-একটি বিধানের সংযোজন-বিয়োজন করে আচরণবিধির খসড়াগুলো চূড়ান্ত করা হয়।

গত রোববার ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের আচরণবিধিতে ইসির অনুমোদন হয়েছে। এগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং হলেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। তিনি জানান, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়ার মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শব্দগত পরিমার্জন ও সংযোজন করা হয়েছে।

‎দীর্ঘ এক দশক দলীয়ভাবে ও দলীয় প্রতীকে ভোটের পর এবার এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নির্দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে। এর আগে ২০১৫ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান চালু করা হয়েছিল। আগের ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভায় মেয়র এবং সিটি করপোরেশনে মেয়র পদের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হতো। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদে নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের আগস্টে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন ও অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাতিল করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সেই অধ্যাদেশ অনুমোদনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নির্দলীয় প্রতীকে হওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

কী আছে আচরণবিধিতে?

ভোটের প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বাদ রাখা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুনের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন এলাকায় একটি করে এবং পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার হবে ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। ব্যানারের আকার সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের (৮.২৭ ইঞ্চি বাই ১১.৬৯ ইঞ্চি) এবং ফেস্টুনের আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভোটের প্রচারসামগ্রী সাদাকালো রাখার বিধান রাখা হয়েছে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে মুদ্রণের তারিখ না থাকা এবং পলিথিনের আবরণ ও পিভিসি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারসামগ্রীতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আকারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। প্রচারে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় আগে বেলা ২টার আগে এবং রাত ৮টার পর মাইকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। তবে ছয় ঘণ্টা মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার করা যেত। নতুন আচরণবিধিতেও মাইক ব্যবহারের সময়সীমা ছয় ঘণ্টা রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বেলা ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো যাবে। তবে একটির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। একই সময়সীমায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।

নির্বাচনী প্রচারণায় ক্যাম্পের সংখ্যাও সীমিত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনী এলাকায় তিনটির বেশি এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ও সাধারণ সদস্য পদের প্রার্থী একটির বেশি নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন করতে পারবেন না। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটি করে ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে। আগের ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি নির্বাচনী ক্যাম্প করার সুযোগ ছিল। আর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ২০ হাজার ভোটারের হারে একের অধিক এবং সর্বোচ্চ পাঁচটির বেশি ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন করতে পারবেন না। সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতিটি সাধারণ ওয়ার্ডে একটির বেশি এবং সাধারণ কাউন্সিল প্রার্থীরা তার ওয়ার্ডে একটির বেশি ক্যাম্প বসাতে পারবেন না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প আগের মতো প্রতি থানায় একটি করে রাখার সুযোগ রয়েছে।

আচরণবিধিতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট পরিষদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এছাড়া ভোটের সময় নির্বাচন পরিচালনার কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউস ও ডাকবাংলো ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও পাঁচ আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন আচরণবিধি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিমালা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন-বিধির সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কার করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় সরকারের পৃথক নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর সংশোধন আরও পর্যালোচনা করে পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

আরও পড়ুন

×