ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতি

পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এলো শরৎ

পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এলো শরৎ
×

শরতের সঙ্গে কাশফুলের নিবিড় সম্পর্ক। ঢাকার পোস্তগোলার সারিঘাট এলাকায় সমকাল

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরতের প্রথম দিন আজ। এই ঋতুর তাৎপর্য শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির রূপান্তরের পাশাপাশি শরৎ মনে করিয়ে দেয় মানুষের জীবনধারা কতটা বদলে গেছে। এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।

বর্ষার পথচলা শেষে ঋতুচক্রে আসে শরৎ। বাংলা বর্ষপঞ্জির ভাদ্র ও আশ্বিন– এ দুই মাস শরৎকাল। সাধারণত নীল আকাশ, সাদা মেঘ ও কাশফুলের ঋতু বলা হয় শরৎকে। তবে সময়ের পরিবর্তনে এ ঋতুকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। বিশেষ করে নগরজীবনে শরৎ এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক চর্চা, পরিবেশগত সংকট ও মানুষের মানসিক অবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বর্ষা থেকে শরতে উত্তরণের সময় প্রকৃতিতে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। বাতাসে আর্দ্রতা কমতে শুরু করে, আকাশ ধীরে ধীরে মেঘমুক্ত হয়, সূর্যালোকের তীব্রতায় পরিবর্তন আসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীতীর, চরাঞ্চল ও উন্মুক্ত প্রান্তরে কাশফুল ফুটতে শুরু করে। অবশ্য নগরায়ণের প্রভাবে অনেক জায়গায় এই দৃশ্য এখন আগের মতো চোখে পড়ে না।

প্রকৃতিবিদদের মতে, বর্ষার পর জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় আকাশ অনেক বেশি পরিষ্কার দেখায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদের মধ্যেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নদী ও জলাভূমিনির্ভর অঞ্চলে উদ্ভিদের নতুন বিকাশ শুরু হয়।

শরতের সঙ্গে কাশফুলের সম্পর্কও বহু পুরোনো। সাধারণত নদীতীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলে কাশফুলের বিস্তার বেশি দেখা যায়। তবে নদীভাঙন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বসতি সম্প্রসারণের কারণে কাশবনের পরিমাণ কমে আসছে বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন।

একসময় ঋতুর পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলত। কৃষিকাজ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সামাজিক অনুষ্ঠান– সবকিছুই ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
কিন্তু নগরায়ণ মানুষের জীবনধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখন শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করছে। বহুতল ভবন, যানজট, খোলা জায়গা কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে।

ফলে ঋতুর পরিবর্তন এখন আর আগের মতো অনুভূত হয় না। শহরের অনেক শিশুই ঋতুর পরিবর্তনকে প্রকৃতির মাধ্যমে নয়; বরং বই, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা শুধু সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশ-সচেতনতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শরৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে শরৎ বারবার ফিরে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশসহ বহু সাহিত্যিক তাদের রচনায় শরৎকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। 

শুধু সাহিত্য নয়, বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতির সঙ্গেও শরতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব হয়। 
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে ঋতুচক্রের ওপরও। পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুর স্থায়িত্ব, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটছে। অনেক সময় বর্ষা দীর্ঘায়িত হওয়ায় শরতের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট প্রকাশ পায় না।

কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা কিংবা কখনও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে ঋতুর প্রচলিত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

×