ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ হওয়ার শঙ্কা

আগস্টে রোগী দ্বিগুণ, পাঁচ বিভাগে প্রকোপ বেশি

এ মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ হওয়ার শঙ্কা
×

 তবিবুর রহমান, ঢাকা ও শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের রেকর্ড গড়ছে, গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন আরও চারজন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা জুলাইয়ের প্রায় দ্বিগুণের বেশি। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৫ হাজার ৮৪৬। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৩ হাজার ২০৫ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনও ঊর্ধ্বমুখী। চলতি সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। এ মাসেই চলতি বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। 

তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে বান্দরবান, বরিশাল বিভাগের সব জেলা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও খুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। সংক্রমণ কমাতে এখনই মশা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

সব জেলায়ই ডেঙ্গু, চলতি বছর মৃত্যু একশ ছুঁইছুঁই: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৮২, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২৩ এবং দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ১৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বরিশালে ১৩২, চট্টগ্রামে ১২০, খুলনায় ২৪৩, ময়মনসিংহে ৬৯, রাজশাহীতে ৮৭, রংপুরে ৭ এবং সিলেটে ১ জন ভর্তি হয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় সব জেলা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এসব এলাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ঘাটতি দূর করতে না পারলে আগামী ২০ বছরেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

আগস্টে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০২ জন এবং ২০২৫ সালের আগস্টে ৭০৫ জন। এবার আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২০২। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ৮৩৪ জন। 

ঢাকার বাইরেও বাড়ছে চাপ
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বেড়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৫০ শয্যার পৃথক ওয়ার্ড খোলা হলেও সেখানে প্রতিদিন ৭০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেই মশারি ব্যবহার করছেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ভর্তির সময় প্রত্যেক রোগীকে বিনা মূল্যে মশারি দেওয়া হয়। অনেকে সেটি ব্যবহার না করে বালিশ বা বিছানার নিচে রেখে দেন।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, রোগীর চাপ বাড়ায় শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকছেন। রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির মশারির ভেতরে থাকা জরুরি। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে তার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কম থাকলেও শনাক্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আগস্টে রেকর্ডসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। 

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি পুরো জাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়, দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে। 

আরও পড়ুন

×