প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেছিলেন—দুই লাখ কর্মী নেবে, নাকচ করল মালয়েশিয়া
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:২২ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৬
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত রোববার বলেছিলেন, আগামী ছয় মাসে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে নিয়োগ দেবে মালয়েশিয়া। চারদিনের মাথায় আজ বুধবার মালয়েশিয়া বলেছে- প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সরকারের ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত হবে না’। মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমস জানিয়েছে, সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে আজ বুধবার এ বিষয়ে কথা বলেন ফাহমি ফাদজিল।
গত রোববার নবনিযুক্ত স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে সচিবালয়ে সাক্ষাত করেন মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওসমানের বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিমন্ত্রী শাহ আলম বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু হবে। ছয় মাসের মধ্যে তা সমাপ্ত হবে বলে হাইকমিশনার জানিয়েছেন। মোট দুই লাখ কর্মী যাবে মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। এর বাইরে আরও ১০ হাজার শ্রমিক বিনা খরচে নেবে মালয়েশিয়া।
ছয় মাসে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বক্তব্যকে বাংলাদেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল। তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান তাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ওই বক্তব্যকে বাংলাদেশের সরকারের ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত হবে না’।
এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্রের সর্বশেষ বক্তব্যে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। ফাহমি বলেছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেই।
গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিওসিএমএসে ২৫ বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছিল, এই এজেন্সিগুলোই কর্মী পাঠাবে। একই পদ্ধতিতে ২০১৬ সালে ১০ এজেন্সি এবং ২০২২ সালে ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। যারা পরবর্তীতে সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। এবারের ২৫ এজেন্সিকেও সিন্ডিকেট বলা হচ্ছে।
এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে গত ২৮ আগস্ট আরও ৩১২ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা করে মালয়েশিয়া। এগুলোকে সহযোগী এজেন্সি বলা হচ্ছে।
এফডব্লিওসিএমএসে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, সিন্ডিকেটে থাকা প্রথম ২৫ এজেন্সির অধীনে ১০টি করে ‘অ্যাসোসিয়েট এজেন্ট’ থাকবে। সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের অধীনে আরও ৬২টি এজেন্সি একই ভূমিকায় থাকবে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীরা এ পদ্ধতিকেও ‘সিন্ডিকেট’ বলছে। তাদের ভাষ্য, ৩১২ সাব এজেন্ট যদি নিজের নামে কর্মী পাঠাতে না পারে, যদি ২৫ এজেন্সির নামে কর্মী পাঠাতে হয়, তাহলে তা সিন্ডিকেট হিসেবেই গণ্য হবে। এতে কর্মী নিয়োগ খরচ আরও বাড়বে।
২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর ২০১৬ সালের শেষে খোলা হয় বাজারটি। সেবার ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয় মালয়েশিয়া। যেগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ এবং ২০১৮- এই দুই বছরে এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান।
জিটুজি প্লাস নামে এই পদ্ধতিতে প্রথমে কর্মী প্রতি ৩৭ হাজার ব্যয় নির্ধারণ করেছিল দুই দেশ। কিন্তু নেওয়া হয়েছিল তিন লাখ টাকা করে। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পর ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বরে এই পদ্ধতি বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ডিসেম্বর দুই দেশ চুক্তি করে। এতে আবারও সুযোগ রাখা হয় মালয়েশিয়া ঠিক করবে কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে। মালয়েশিয়া ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে। এগুলোর অধিকাংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। পরে বোয়েসলসহ আরও ৭৬ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ কর্মী এই পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যান। কর্মী প্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। জরিপ অনুযায়ী গড়ে নেওয়া ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। প্রায় ১৭ হাজার কর্মী এ কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়া যেতে পারেনি।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানান। এর দুই মাস পর এজেন্সি বাছাইয়ের মাধ্যমে খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে আগের দুইবারের মত এবারও সিন্ডিকেটের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।