ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়ছে, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেই

ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়ছে, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেই
×

প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা যে গতিতে বাড়ছে, নতুন সক্ষমতা সে অনুপাতে বাড়ছে না। ২০১৫ সালে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ছিল ১৪১ গিগাবিট (জিবিপিএস)। ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে (টিবিপিএস)। ২০২৮ সালে চাহিদা ২৭ টিবিপিএস এবং ২০৩০ সালে ৫৪ টিবিপিএসে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

চাহিদা বাড়ার এই প্রবণতা অনেক দিনের। তার পরও নতুন সাবমেরিন কেবল ও বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কাটছে না। সরকারি নতুন কেবল প্রকল্পের বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। বেসরকারি খাতের একটি প্রকল্পে রুট জরিপ, বিনিয়োগ, কেবল ও কারিগরি সরঞ্জাম তৈরির কাজ শেষ হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চূড়ান্ত ছাড়পত্র মিলছে না।

ফলে আগামী কয়েক বছর প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রধান ভিত্তি দুটি সাবমেরিন কেবল। এর একটি পুরোনো এবং অন্যটির লিটআপ (ব্যবহারিক) সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে। নতুন সাবমেরিন কেবল না এলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে স্থলপথে, বিশেষ করে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। এখনই দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যান্ডউইথ আসে ভারত হয়ে।

চাহিদা বাড়ছে দ্রুত
গত ১১ বছরে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা বেড়েছে ৯৫ গুণের বেশি। বর্তমানে মোট আন্তর্জাতিক ট্রাফিক প্রায় ১২ দশমিক ১ টিবিপিএস। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত কয়েক দশকে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বেড়েছে। প্রায় আড়াই বছরেই চাহিদা দ্বিগুণ হচ্ছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে ৫৪ টিবিপিএসের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ২০৩২ সালে চাহিদা ১০৮ টিবিপিএস, ২০৩৪ সালে ২১৬ টিবিপিএস এবং ২০৩৫ সালে ৩০৫ টিবিপিএস পর্যন্ত যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

পুরোনো দুই কেবলেই ভরসা
দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রধান উৎস সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। দুটির সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টিবিপিএস। তবে নকশাগত সক্ষমতা আর বাস্তবে লিটআপ সক্ষমতা এক নয়।

সি-মি-উই-৪ বাংলাদেশে যুক্ত হয় ২০০৫ সালে। কেবলটির প্রাথমিক পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ছিল ২০ বছর। এর জীবনকাল বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হলেও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে এর দক্ষতা কমে গেছে।
সি-মি-উই-৫-এর লিটআপ সক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ২ টিবিপিএস। এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৮৮ টিবিপিএস ব্যবহার হচ্ছে। অব্যবহৃত রয়েছে প্রায় ৭১২ জিবিপিএস। অর্থাৎ, বর্তমান অব্যবহৃত সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার তুলনায় খুব বড় নয়।

আঞ্চলিক দেশগুলো এগিয়েছে বহু গুণ
সাবমেরিন কেবল সংযোগের বৈচিত্র্যেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। বাংলাদেশ বর্তমানে দুটি প্রধান সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে ভারতের সঙ্গে ১৯টি, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২৩ এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ১২টি সাবমেরিন কেবল যুক্ত রয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও একাধিক আন্তর্জাতিক রুট তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে বিভিন্ন সাবমেরিন সিস্টেমের মাধ্যমে একাধিক বিকল্প সংযোগ রয়েছে।

বেসরকারি প্রকল্পও আটকে
নতুন সক্ষমতা তৈরিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিটিআরসি সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকমকে সাবমেরিন কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের লাইসেন্স দেয়। তিন প্রতিষ্ঠান মিলে বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম গঠন করে। ২০২৪ সালের শুরুতেই প্রকল্পের রুট জরিপ শেষ হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে কেবল স্থাপন এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক সেবা চালুর কথা।

প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা।  লাইন স্থাপনে বিদেশি খরচ মেটাতে চার কোটি ২০ লাখ ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে তিন কোটি ২০ লাখ ডলার ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, নৌপরিবহন, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, পরিবেশসহ বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনএসআইয়ের ছাড়পত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত ৬ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘সিএস ব্লু নেভিগেটর’ ও ‘এনডেভার’ জাহাজ দুটিকে অন্যান্য অনুমোদন সাপেক্ষে জলসীমায় প্রবেশের অনাপত্তি দেয়। ১২ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে চিঠি দেওয়ায় বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা চায়। ২৯ জুলাই এনএসআইকে দেওয়া চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের অগ্রায়ন ছাড়া বেসরকারি কেবল স্থাপনের ছাড়পত্র না দিতে বলা হয়। ৩০ জুলাই কনসোর্টিয়াম গঠনে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছিল কিনা, তা নিয়েও বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার চীনভিত্তিক এইচএমএন টেক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেবল স্থাপনে তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে এ আপত্তির সঙ্গে একমত নন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। মেটাকোর সাবকমের সিইও মোহাম্মদ আমিনুল হাকিমের দাবি, প্রকল্পে চীনা কোনো সক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে না; দুই প্রান্তে নকিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সি-মি-উই-৬ নিয়েও অনিশ্চয়তা
সরকারি পর্যায়ে নতুন সক্ষমতার বড় প্রত্যাশা সি-মি-উই-৬কে ঘিরে। ২০১৯ সালে উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয়েছে। ২০২১ সালে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সইয়ের পরও নির্ধারিত সময়ে কেবলটি চালু করা যায়নি। ২০২৬ সালের শেষ দিকে সেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। কেবলটি চালু হলে বাংলাদেশ প্রায় ৩০ টেরাবিট/সেকেন্ড অতিরিক্ত সক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

বাড়তে পারে ভারতনির্ভরতা
নতুন সাবমেরিন কেবল সময়মতো যুক্ত না হলে বাড়তি ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক স্থলপথ, বিশেষ করে ভারতের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিডিনেট কমিউনিকেশন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ২০০৫ সালের কেবলের ২০ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। সি-মি-উই-৫-এর ক্ষমতা শেষের দিকে। সি-মি-উই-৬ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। চাহিদা বাড়তে থাকলে ভারত থেকেই অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর মতে, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

অর্থনীতি ও বিনিয়োগেও প্রভাব
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এখন শুধু সস্তা শ্রম বা বড় বাজার যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বড় বিনিয়োগের জন্য উচ্চগতির আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রয়োজন। এই সক্ষমতায় ঘাটতি থাকলে নতুন বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ব্যান্ডউইথের সংকটের প্রভাব শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে এর প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও। পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংযোগ না থাকলে সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং, ই-কমার্স, ক্লাউড সেবা ও ডেটা সেন্টারের মতো খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

একাধিক কেবল প্রয়োজন
টেলিযোগাযোগ খাতের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে। একটি বা দুটি কেবল দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। একাধিক সাবমেরিন কেবল প্রয়োজন। সরকার সি-মি-উই-৬সহ নতুন কেবল নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।

আরও পড়ুন

×