সরকারের ভরসা ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
ফাইল ফটো
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৭ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যাস ও কয়লার সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার। স্বল্প মেয়াদে লোডশেডিং কমাতে দ্রুত উৎপাদনে আনা সম্ভব এমন কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলতি মাসে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে গড়ে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এ লক্ষ্যে ৫৩ কেন্দ্রের জন্য এক মাসে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস অয়েল চেয়েছে সংস্থাটি। ৫৩ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে চলতি মাসে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে এই পরিমাণও একবারে পাওয়া যাবে না; ধাপে ধাপে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
৬ হাজার কোটি টাকার জোগান
জ্বালানি সংকটের মধ্যে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো চালাতে অর্থের সংস্থানও করেছে সরকার। ফার্নেস অয়েল কেনার জন্য গত সপ্তাহে পিডিবিকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি ১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে সামিট গ্রুপের চারটি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য ৫৩৩ কোটি এবং ইউনাইটেড পাওয়ারের চারটি কেন্দ্রের জন্য ৪৩৩ কোটি টাকা রয়েছে। এ ছাড়া ডোরিন গ্রুপ ৩৩৩ কোটি, অ্যাকর্ন গ্রুপ ২২৩ কোটি, ওরিয়ন ২২৩ কোটি, লংকা গ্রুপ ১২৩ কোটি, বারাকা পাওয়ার ২৩৩ কোটি, ইপিভি ঠাকুরগাঁও ও চট্টগ্রাম ১৯৬ কোটি, ইনডেক্স গ্রুপ ১০০ কোটি, আরপিসিএল ২০০ কোটি, বিআর পাওয়ারজেন ৪৫০ কোটি, আনলিমা এনার্জি ২২০ কোটি, মধুমতি বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫০ কোটি, হোসাফ গ্রুপ ২০০ কোটি, দেশ এনার্জি ২২০ কোটি এবং মিডল্যান্ড গ্রুপ ২৪০ কোটি টাকা পেয়েছে।
সরকারি কেন্দ্রগুলোর তালিকাভুক্ত বরাদ্দের পরিমাণ ৫৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিতাসের ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র পেয়েছে ৫৪ কোটি টাকা। বাঘাবাড়ী ৫৯ কোটি, দোহাজারী ৬৪ কোটি, হাটহাজারী পিকিং প্লান্ট ১০১ কোটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ১২৬ কোটি, কাটাখালীর ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ৪৩ কোটি, সান্তাহারের ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ৩২ কোটি, ফরিদপুরের ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ৩৮ কোটি এবং গোপালগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ৮২ কোটি টাকা পেয়েছে।
আসছে বেসরকারি কেন্দ্রের তেল
পিডিবির কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার পর কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র খুলেছে। তবে এসব চালান দেশে পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিক তেল সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব চালান খুব বেশি কাজে আসবে না।
মজুতও কম
৫ সেপ্টেম্বর দিন শেষে সরবরাহযোগ্য ফার্নেস অয়েলের মজুত ছিল মাত্র ১৪ হাজার ৭৫১ টন। মাসের বাকি সময়ে আরও ১ লাখ টন আমদানি এবং স্থানীয় উৎস থেকে ২৫ হাজার টন পাওয়ার কথা রয়েছে। বিপরীতে পিডিবির চাহিদা ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন। ফলে চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে আরও ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে সব খাত মিলিয়ে বিপিসি ৩১ হাজার ৯০২ টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করেছে। দৈনিক গড় বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩৮০ টনে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার পাশাপাশি শিল্প খাতের সরবরাহও অব্যাহত রাখতে হচ্ছে বিপিসিকে।
বিপিসিরও আমদানি ও খালাস সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি সম্ভব। এর বেশি আমদানিতে অতিরিক্ত অবকাঠামোগত সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে দ্রুত আমদানি বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বন্ধ পাঁচ কেন্দ্রও চালুর উদ্যোগ
তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঁচটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রকে ‘বিদ্যুৎ নেই, টাকা নেই’ ভিত্তিতে চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করতে পারলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করা হবে।
বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ
গ্যাস ও কয়লার চেয়ে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেশি। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়লে পিডিবির বিদ্যুৎ কেনার খরচও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে সরকারের ভর্তুকির ওপর।
এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া জমেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র নিজস্ব অর্থে জ্বালানি কিনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সারাদেশে বেড়েছে লোডশেডিং। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর জাতীয় গ্রিডে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৭৭৩ থেকে ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে বেলা ৩টায়। ওই সময় ১৬ হাজার ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশে মোট ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১ হাজার ৬২০ এবং এলএনজি ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এই সরবরাহ দিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা পূরণ করা যায়নি।
বিকেল ৪টার দিকে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৫২৮ মেগাওয়াট। ওই সময় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৮৬১ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৭২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ভারত থেকে এসেছে ২ হাজার ১৫১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে আদানির কেন্দ্র থেকে সরবরাহ ছিল ১ হাজার ২২০ মেগাওয়াট।
- বিষয় :
- গ্যাস
- গ্যাস সংকট
- কয়লা
- বিদ্যুৎ উৎপাদন
- জ্বালানি সংকট