সার কারখানায় গ্যাস
শর্ত ভঙ্গ করায় নতুন দামে বিল দিতে রাজি নয় বিসিআইসি
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু গ্যাস দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা। উৎপাদন বন্ধ থাকার সময় প্লান্ট সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত গ্যাসও বর্ধিত দামে পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে চার ইউরিয়া সার কারখানার ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্লান্ট প্রিজারভেশন বা সংরক্ষণ কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সার পরিবর্তে আগের দাম ১৬ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিল্প সচিবকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ইউরিয়া সার উৎপাদনের মূল কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশে গ্যাসের ঘাটতির কারণে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখায় বছরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় সার কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। এ সব কারখানায় বিভিন্ন ধরনের ক্ষয়কারী রাসায়নিক ব্যবহৃত হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্লান্ট ও যন্ত্রপাতি ক্ষয় রোধে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করতে হয়।
বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি ইউরিয়া সার কারখানায় ন্যূনতম ১৮ লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যে বছরে ৩৩০ দিন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য বিসিআইসির জন্য অতিরিক্ত সাত কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির ফলে মিশ্রিত গ্যাসের গড় ব্যয় ২৮ টাকা ৭৮ পয়সা নির্ধারণ করে সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠায় পেট্রোবাংলা।
বিইআরসির কারিগরি দলের মূল্যায়নে বলা হয়, প্রস্তাবিত অতিরিক্ত সাত কার্গো এলএনজি আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা কর্তৃক কেনা দেশীয় উৎপাদিত ও আমদানিকৃত মিশ্রিত গ্যাসের প্রতি ঘনমিটারের ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২১ টাকা ১৫ পয়সা।
বিইআরসি আয়োজিত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানিতে বিসিআইসি বলেছিল, প্রতিদিন ১৯৭ এমএমসিএফডি গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা হলে এবং বছরে ৩৩০ দিন হিসাব করলে যৌক্তিক পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো যেতে পারে। তবে দৈনিক ১৯৭ এমএমসিএফডির চেয়ে কম গ্যাস সরবরাহ করা হলে প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা হিসাবে গ্যাসের বিল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিসিআইসি।
পেট্রোবাংলা মিশ্রিত গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ২১ টাকা ১৫ পয়সা নির্ধারণ করলেও প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৯ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করে আদেশ জারি করে বিইআরসি। একই সঙ্গে চারটি সার কারখানায় ৭০ শতাংশ লোডে বছরে ন্যূনতম ৩৩০ দিন গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই শর্ত মানা হয়নি বলছে বিসিআইসি।
বিসিআইসি বলেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভর্তুকি নীতিমালা অনুযায়ী উৎপাদনের পরিমাণের ভিত্তিতে সার কারখানা ভর্তুকি পায়। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে সার উৎপাদন সম্ভব হয় না। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার স্বাভাবিক সব ব্যয় অব্যাহত থাকে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় দৈনন্দিন ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যবহৃত গ্যাসের বিল পরিশোধ করতেও কারখানাগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিসিআইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চারটি কারখানা প্লান্ট প্রিজারভেশনের কাজে মোট চার কোটি ৬৬ লাখ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছে। প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সা হিসাবে এর দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আর আগের দাম ১৬ টাকা হিসাবে একই গ্যাসের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বিসিআইসি জানিয়েছে, ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানা গত অর্থবছরে ৩২ দিন বন্ধ ছিল। শাহজালাল সার কারখানা ৪৪ দিন বন্ধ ছিল। যমুনা সার কারখানা ১৬৪ দিন বন্ধ ছিল। চিটাগাং ইউরিয়া কারখানা বন্ধ ছিল ১৭৩ দিন ।
বিসিআইসি আরও বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে ২০২২ সালে সার কারখানায় প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম চার টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়। কিন্তু এরপরও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়নি। পরে অতিরিক্ত সাত কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়ে ৩৩০ দিন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে সার খাতে গ্যাসের দাম ২৯ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
বিসিআইসির যুক্তি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাবে— এমন প্রত্যাশায় তারা বর্ধিত মূল্য মেনে নেয়। কিন্তু শর্ত অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। অথচ বর্ধিত মূল্যে বিল দাবি করছে। এতে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত জুলাই পর্যন্ত কারখানাগুলোকে গ্যাস খাতে অতিরিক্ত ৬২ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, গ্যাসের ঘাটতি মূলত জাতীয় সরবরাহজনিত সামগ্রিক সমস্যা। তবে এর পাশাপাশি বর্ধিত গ্যাসের দাম এবং গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ থাকায় সৃষ্ট আর্থিক লোকসান নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা নিষ্পত্তির জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি পথ রয়েছে।
তিনি জানান, বিইআরসি আইনের ৪০ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বা লাইসেন্সধারী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারে। এ ধারায় অভিযোগ দাখিল হলে পূর্ণাঙ্গ কমিশন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বিষয়টি শুনানি করে এবং মেরিটের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত দেয়।
আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, কমিশনের দেওয়া প্রথম সিদ্ধান্তে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট হলে আইন অনুযায়ী পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) সুযোগও রয়েছে।
- বিষয় :
- বিসিআইসি
- সার
- গ্যাস
- পেট্রোবাংলা