সাইবার আইনের খসড়ায় অপব্যবহারের শঙ্কা
গুজব-অপতথ্যে ১০ বছর কারাদণ্ড, কনটেন্ট ব্লকে বিচারিক অনুমোদনের দাবি
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৫৩
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি ধারা অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়ায় এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির মতে, খসড়াটি বর্তমান রূপে চূড়ান্ত হলে সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা ও ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব উদ্বেগ জানিয়ে খসড়ার বিতর্কিত ও অস্পষ্ট বিধান পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।
সংগঠনটি বলেছে, সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, পরিচয় চুরি, প্রতারণা ও অননুমোদিত প্রবেশের মতো অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নাগরিকের মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার যেন সংকুচিত না হয়।
গুজব-অপতথ্যে ১০ বছর কারাদণ্ড
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এইচআরএসএসের আপত্তি, ‘অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য’কে গুজব এবং ‘মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য’কে অপতথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও এসব শব্দের প্রয়োগের সীমা স্পষ্ট নয়।
সংগঠনটির মতে, কোনো তথ্য অযাচাইকৃত হওয়া এবং মিথ্যা হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব নাও হতে পারে। অযাচাইকৃত তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কিংবা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ‘আশঙ্কা’র মতো ব্যাপক শব্দের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
মানহানি ও বুলিং নিয়েও আপত্তি
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি ও ডিজিটাল শিশু নিপীড়নের মতো অপরাধের পাশাপাশি মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকরণ ও বুলিংকে একই ধারায় যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
এইচআরএসএস বলেছে, নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য তৈরি বিশেষ সুরক্ষা ধারার সঙ্গে মানহানি ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে একীভূত করা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ, কার্টুন, প্রতিবাদী বক্তব্য বা সামাজিক বিতর্ককে ‘হেয়প্রতিপন্ন’ কিংবা ‘মানহানিকর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
‘হেয়প্রতিপন্ন’ করার প্রস্তাবিত সংজ্ঞাকেও অতিরিক্ত বিস্তৃত বলে মনে করছে সংগঠনটি।
মিম শেয়ারেও ফৌজদারি দায়ের আশঙ্কা
প্রস্তাবিত ২৭ ধারায় কোনো কনটেন্ট শেয়ার করাকেও প্রচার হিসেবে গণ্য এবং সহায়তার শাস্তি মূল অপরাধের সমান করার প্রস্তাব রয়েছে। এইচআরএসএসের বক্তব্য, এতে কনটেন্ট নির্মাতা ও শেয়ারকারীর ভূমিকার পার্থক্য উপেক্ষিত হতে পারে।
মিম, ব্যঙ্গ, প্যারোডি, কার্টুন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ব্যতিক্রম না থাকলে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, শিল্পী ও অনলাইন ব্যবহারকারীরা ফৌজদারি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলেও আশঙ্কা জানিয়েছে সংগঠনটি।
কনটেন্ট ব্লকে বিচারিক অনুমোদনের দাবি
কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে এইচআরএসএস। খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থাকে কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, বিচারিক আদেশ ছাড়া কনটেন্ট ব্লক করার সুযোগ রাখা উচিত নয়।
কোনো কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করলে নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল কিংবা কার্যক্রম স্থগিতের ক্ষেত্রেও স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা, লিখিত কারণ, নোটিশ ও কার্যকর আপিলের সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছে তারা।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান এবং একাধিক মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাকে সদস্য করার প্রস্তাবের পাশাপাশি বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের সরকার মনোনীত করার বিধান কাউন্সিলের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে এইচআরএসএস।
স্বাধীন সাইবার বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
বেআইনি গ্রেপ্তার, কনটেন্ট অপসারণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার নাগরিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে উন্মুক্ত পরামর্শের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস। একই সঙ্গে গুজব ও অপতথ্য-সংক্রান্ত ধারা পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহার, অস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা এবং সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গ, কার্টুন, প্যারোডি, রাজনৈতিক সমালোচনা ও জনস্বার্থভিত্তিক মতপ্রকাশের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষার দাবি করেছে তারা।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা নাগরিকের অধিকার রক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের অজুহাত নয়।
- বিষয় :
- এইচআরএসএস