জবানবন্দিতে সাব্বির ওসমানী: বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে লাশ ফেলা হতো
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৪৮ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৫৩
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির রহমান ওসমানী। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ নম্বর সাক্ষী। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে র্যাবে থাকা অবস্থায় ২০১০ সালের মে মাস থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটায় এবং সুন্দরবন এলাকায় র্যাবের পরিচালক (গোয়েন্দা) হিসেবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বিচারবহির্ভূত হত্যার বর্ণনা তুলে ধরেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। আদালতে তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সিপাহী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে হাত-পা ও চোখ বেঁধে গুলি করা হয়। পরে তাদের পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে পানিতে ফেলে লাশ গুম করা হতো। তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের উপস্থিতি ও নির্দেশে র্যাব-৮-এর গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। এ সময় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় জিয়াউল আহসান উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির রহমান ওসমানী বর্তমানে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনাতে ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তিনি র্যাব-৮-এ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে র্যাবে বদলি করা হয়। তখন তিনি মেজর ছিলেন। তখন র্যাবের ডিজি ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার। এডিজি (অপস) ছিলেন কর্নেল মতিউর রহমান। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান।
জবানবন্দির শুরুতেই মেজর (অব.) সাব্বির রহমান বলেন, ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে একদিন রাতে অফিস চলাকালে জিয়াউল আহসান তার সরকারি গাড়ি এবং মাইক্রোবাস নিয়ে বরিশাল ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। তিনি সরাসরি অধিনায়কের অফিসে প্রবেশ করেন। আমি অধিনায়কের অফিসে উপস্থিত হলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়া কুশল বিনিময় করে আমাকে নিয়ে তার গাড়িতে করে বের হন। আনুমানিক দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট গাড়ি চলার পর পাথরঘাটাস্থ চরদুয়ানী ঘাটে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে পূর্ব থেকেই র্যাবের ইন্ট উইংয়ের র্যাব-৮-এ সংযুক্ত র্যাব সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। প্রথমে মাইক্রোবাস থেকে ঢাকা থেকে আসা ইন্ট উইংয়ের সদস্যরা নেমে ট্রলারে উঠতে থাকেন। সে সময় একজন ব্যক্তিকেও হাত বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা অবস্থায় ট্রলারে উঠিয়ে নিতে দেখি। হাত বাঁধা লোকটিকে ট্রলারের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়।
জিয়ার নির্দেশে তারা চরদুয়ানী খাল থেকে বের হয়ে মোহনার দিকে যেতে থাকেন। আনুমানিক তিন ঘণ্টা ট্রলার চালানোর পর জিয়াউল বোটে অবস্থানরত ইন্ট উইংয়ের সদস্যদের খোলের ভেতর থেকে হাত বাঁধা লোকটিকে বের করে আনতে বলেন। হাত বাঁধা লোকটিকে বোটের বাইরে আনার সঙ্গে সঙ্গে র্যাবের চারজন সদস্য তার হাত বাঁধা ব্যক্তির গলা ও পা বরাবর দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে ফেলেন। এরপর ধৃত ব্যক্তির মাথা ও কান বরাবর একটি ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করেন। এরপর তারা ওই গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে ফেলেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ওসমানী বলেন, একজন র্যাব সদস্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাটা পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পেট কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করেন। এরপর নদীতে জোয়ার-ভাটা থাকায় পানির গভীরতা মেপে কর্নেল জিয়া ট্রলারের গতি কমিয়ে ইন্ট উইংয়ের ওই চারজন র্যাব সদস্যকে গুলিবিদ্ধ দেহটি সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ পানিতে ফেলে দিতে বলেন।
পরবর্তীতে চরদুয়ানী থেকে জিপ ও মাইক্রোবাসযোগে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথিমধ্যে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য জিয়াউল নিজেই বলে ওঠেন, ‘এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদেরকে গলফ করতে হবে।'
২০১০ সালের মে মাসের দিকে একই রকম আরেকটি ঘটনার বর্ণনা দেন সাব্বির রহমান ওসমানী। সেটি ছিল চারজনকে হত্যার ঘটনা। ওসমানী বলেন, এই ঘটনার আনুমানিক দুই-তিন মাস পর গোয়েন্দা তথ্য মারফত জানতে পারি যে, পেট কাটা লাশটির ডিএনএ বিজিবির গোয়েন্দা সদস্যদের মাধ্যমে পরীক্ষা করে ব্যক্তিটিকে সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুল বলে শনাক্ত করেন।
যে ট্রলারে করে নিয়ে ভিকটিমদের হত্যা করা হতো, সেই ট্রলারের আলকাছ মাঝি প্রসঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওসমানী বলেন, ২০১১ সালের জুনে হঠাৎ করেই কর্নেল জিয়া একদিন ফোন করে বলেন, আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে। যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে।’ এ কথা বলে কর্নেল জিয়া আমাকে আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন।
মেজর সাব্বির রহমান বলেন, শুধু চরদুয়ানীতেই নয়, সুন্দরবনেও এ রকম কার্যক্রম চালানোর কথা উল্লেখ করে ওসমানী বলেন, জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনায় এবং নির্দেশনায় তিনটি সুন্দরবনকেন্দ্রিক তথাকথিত এনকাউন্টার অভিযান পরিচালনা প্রত্যক্ষ করি। আনুমানিক ২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিম সুন্দরবনের নিশানখালী খালসংলগ্ন বনে তৎকালীন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বনদস্যু বাহিনী রাজুর গোপন আস্তানায় তথাকথিত একটি এনকাউন্টার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়ার পরিকল্পনা এবং নির্দেশে অপারেশনটি র্যাব, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেছিল। যেখানে জিয়াউলের নির্দেশে র্যাব-৮-কে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল।
এসব অভিযানে র্যাব সদরদপ্তর থেকে জিয়াউল এবং তার উইংয়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি র্যাব সদরদপ্তরের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহাইল এবং তার সঙ্গে বেশ কিছু সংখ্যক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা অভিযানে উপস্থিত ছিলেন।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতেও সুন্দরবনে মোহনার কাছাকাছি আরেকটি অভিযান চালানো হয়। ওই সময় মাথায় টুপি পরানো ও হাত বাঁধা অবস্থায় পাঁচজন ব্যক্তিকে ট্রলারের খোলের ভেতরে ঢুকানো হয়। পরে তাদেরকে একে একে বের করে নিয়ে এসে যথারীতি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মাথায় গুলি করে, পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এভাবে মোট চারজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এরপর জিয়াউলের নির্দেশে ট্রলারের খোলের ভেতর থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় পঞ্চম ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে তাকে বনের ভেতরে ফায়ার করা হয়।
মেজর ওসমানী বলেন, পরবর্তীতে ২০১২ সালের মার্চে জিয়া স্যারের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সুন্দরবনের ভোলা নদীসংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় একটি ত্রিমাত্রিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই সময় স্থানীয় থানা পুলিশের মাধ্যমে বন তল্লাশি করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এই অভিযানে র্যাব সদরদপ্তরের তৎকালীন এডিজি (অপস) কর্নেল মুজিব, পরিচালক লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের কমান্ডার সোহাইল, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা কমোডর সোহাইলের আমন্ত্রণে র্যাব-৮ বরিশালে এসে উপস্থিত হতেন। পরবর্তীতে তাদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে পৃথক ট্রলারে করে মূল আভিযানিক দলের একদম শেষের দিকে রাখা হতো।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার ভাষ্য, এই তিনটি এনকাউন্টার অভিযানগুলোর সবগুলোই ছিল সাজানো। এসব ঘটনার বর্ণনা করে সাব্বির ওসমানী বলেন, র্যাবের দায়িত্ব পালনকালে জিয়াউল আনুমানিক ১৫-২০ বার বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে গলফ অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, র্যাবের এই দায়িত্ব থাকার সময় এই মানসিক যন্ত্রণার কোনো প্রতিকার আমার কাছে ছিল না, বিধায় আমি র্যাবে অবস্থানকালীন আমার চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হলে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের জন্য দরখাস্ত করি। সেই মোতাবেক আমি আমার নিজবাহিনীতে ফেরত এসে সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম ছয় মাস অবস্থান করে ২০১৪ সালের মার্চে এলপিআরে যাই।
গুমের এই মামলায় এরই মধ্যে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইয়া, হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সেনা কর্মকর্তা এবং র্যাবের কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলাটিতে এখন তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য নেওয়া হবে। এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে যাবে। বিগত ১৬ বছরে গুমের অভিযোগে হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম মামলা, যার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক মানুষকে গুম করে হত্যার ঘটনায় তিনটি অভিযোগ এনে অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ এরপর ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল