ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

কিশোরী বয়স থেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার তাগিদ

কিশোরী বয়স থেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার তাগিদ
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাসিকের অনিয়মকে এড়িয়ে যাওয়া, শরীরের হঠাৎ পরিবর্তনকে গুরুত্ব না দেওয়া, স্তনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেও চিকিৎসক না দেখানোর মতো অবহেলা ও সংকোচ দূর করার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ, কিশোরী বয়স থেকেই নিজের শরীর সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে অনেক জটিলতা শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব।

গতকাল মঙ্গলবার সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অডিটোরিয়ামে নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে এ সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট। এতে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), বন্ধ্যত্ব, স্তন ক্যান্সার, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষার্থী কিশোরীদের দেওয়া হয় প্যাড ব্যাংক।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা পিসিওএস, মাসিককালীন স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, স্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন করেন। প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়েও মতবিনিময় হয়।
স্বাগত বক্তব্য দেন সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম খান। 

আলোচনায় পিসিওএস নিয়ে প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন গাইনোকোলজিস্ট ও বন্ধ্যত্ব এবং আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন আব্বাসী। তাঁর মতে, পিসিওএসকে কেবল ডিম্বাশয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে অন্যান্য শারীরিক জটিলতা আড়ালে থেকে যেতে পারে। পিসিওএস হচ্ছে হরমোন ও বিপাকীয় ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতা।

তিনি বলেন, ‘দুই-তিন মাস পরপর মাসিক হওয়া, অতিরিক্ত রক্তস্রাব বা তীব্র ব্যথা, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত লোম, ব্রণ কিংবা অতিরিক্ত চুল পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনা না হলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং ভবিষ্যতে গর্ভধারণে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।’
পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি জাঙ্ক ফুড ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলার কথা বলেন ডা. শারমিন। তাঁর পরামর্শ, ‘শারীরিক পরিবর্তন বা মাসিকের অনিয়ম দেখা দিলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।’

অনুষ্ঠানে স্তন ক্যান্সার নিয়েও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল। তিনি রোগ শনাক্তকরণে স্ক্রিনিং ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। রোগের ধরন, পর্যায় ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। 
নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতার ভিত্তি তৈরিতে কিশোর বয়সকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা। তিনি কিশোরীদের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন, বিশেষ করে মাসিক সম্পর্কে বয়স-উপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এতে নিজের শরীর সম্পর্কে ভয় বা ভুল ধারণা কমবে এবং প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও আলোচনায় আসে। মাইড কেয়ারের সাইকোলজিস্ট তানিয়া সুভাষিতা বলেন, ‘স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়, সংকোচ কিংবা সামাজিক চাপ অনেক সময় নারীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া থেকে দূরে রাখে।’ এ জন্য পরিবার ও সমাজের সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেন তিনি।
পাওয়ার অব শি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সাবিনা স্যাবি বলেন, ‘নারীর স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার।’ নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবারে, বিশেষ করে মা ও মেয়ের মধ্যে খোলামেলা আলাপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের কাছেও স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট। ২০১৭ সাল থেকে নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নেটওয়ার্কিং নিয়ে কাজ করছে পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট। ২০২০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত উইমেন সামিট অ্যান্ড এক্সিবিশন আয়োজন করছে। নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে যে নীরবতা ও সংকোচ রয়েছে, তা ভাঙাই এমন কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন সাবিনা স্যাবি। 

আরও পড়ুন

×