ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর দুই সফরে অগ্রাধিকার পাবে অর্থনৈতিক কূটনীতি

প্রধানমন্ত্রীর দুই সফরে অগ্রাধিকার পাবে অর্থনৈতিক কূটনীতি
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাপান ও সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও গভীর করতে চায় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন দুই দেশ সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে চার দিনের সফরে জাপান যাবেন প্রধানমন্ত্রী। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফর হবে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। সৌদি সফরের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

গতকাল শনিবার ঢাকায় এক সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গভীর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন খাতে সুনির্দিষ্ট অংশীদারিত্বের সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর সফরগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে। জাপান ও সৌদি আরব সফরেও এ দুই বিষয়ে বিশেষ নজর থাকবে।

জাপানের কাছে বাজেট সহায়তা
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, জাপান সফরে ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। চলতি ও আগামী অর্থবছরে দুই কিস্তিতে ৫০ কোটি ডলার করে এ সহায়তা চাওয়া হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সামলাতে এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।

জাপানের সঙ্গে আলোচনায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগও গুরুত্ব পেতে পারে, বিশেষ করে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয়, ঋণের শর্ত ও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং ঋণের শর্ত আরও সহজ করার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা এবং জাপানে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। গত বছর জাপান পাঁচ বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। দক্ষ কর্মী তৈরি ও ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে দেশটির সহযোগিতা রয়েছে। গত বছরের মে মাসে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরে ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এসব সমঝোতা স্মারকের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চেয়েছেন। জাপানের কাছ থেকেও এ ধরনের সহায়তা চাওয়া হতে পারে।

সৌদির সঙ্গে জ্বালানি ও বিনিয়োগ
সৌদি আরব সফরে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তায় জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। এসব তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো এবং এ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসতে পারে। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরবের কোনো বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতি এখনও নিশ্চিত হয়নি।

গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্য কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক বিনিয়োগ বাড়াতে চায় দুই দেশ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসার পরিবেশ স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও কল্যাণও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রশিক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে চায় সরকার।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় শ্রমবাজার ও জ্বালানি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে সৌদি বিনিয়োগের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর সফরে আলোচনায় আসতে পারে।

আলোচনায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে গত আগস্টে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। এর মূল নীতি হলো, কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে সরকার। 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিও বিবেচনায় থাকবে। মুসলিম বিশ্বের কল্যাণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন

×