চীনের বাজারে বাংলাদেশের আম-কাঁঠালের বড় সম্ভাবনা
জাহিদুর রহমান, গুয়াংজু (চীন) থেকে
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীনের গুয়াংজু শহরের ফলের পাইকারি বাজারে বিশ্বের নানা দেশের ফলের সমাহার। থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান, ভিয়েতনামের ড্রাগন, চিলির চেরি, অস্ট্রেলিয়ার আঙুর কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা ধরনের মৌসুমি ফল চাহিদা অনুযায়ী আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। বিশাল এই বাজার থেকে ফল ছড়িয়ে পড়ে চীনের বিভিন্ন শহরের পাইকার, সুপারশপ, ফলের দোকান ও অনলাইন বিক্রয়কেন্দ্রে।
গুয়াংজুর জিয়াংনান ফল ও সবজি পাইকারি বাজার চীনের আমদানি করা ফলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রায় চার লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বাজারটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার টন ফল ও সবজির লেনদেন হয়। এর মধ্যে ফলের পরিমাণই কয়েক হাজার টন। আমদানি করা ফলের বড় একটি অংশ এই বাজারের মাধ্যমে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছায়। ভোরের দিকে বাজারের আমদানি করা ফলের অংশে বেচাকেনার ব্যস্ততা বিশেষভাবে বেড়ে যায়।
এই বাজার বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের জন্যও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। দেশের সুস্বাদু আম, কাঁঠাল ও পেয়ারা চীনের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারলে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে, তৈরি হবে নতুন বাজার। কিন্তু চীনের বাজারে প্রবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার পরও বাংলাদেশের আম রপ্তানি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কাঁঠাল রপ্তানির অনুমোদন মিললেও বাণিজ্যিক চালান পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বড় চ্যালেঞ্জ। পেয়ারা রপ্তানির বিষয়টিও আলোচনার পর্যায়ে।
বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনসের (ডব্লিউআইটিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন বিভিন্ন দেশ থেকে তাজা বা শুকনা আম, পেয়ারা ও ম্যাঙ্গোস্টিন মিলিয়ে প্রায় ২৯ কোটি ২৬ লাখ কেজি ফল আমদানি করেছে। এসব পণ্যের সম্মিলিত আমদানি মূল্য প্রায় ৬৭ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট তিন ধরনের ফলের জন্যই চীনে বড় আমদানিবাজার রয়েছে। এই বাজারে থাইল্যান্ডের অবস্থান শক্তিশালী। ২০২৪ সালে দেশটি থেকে আম, পেয়ারা ও ম্যাঙ্গোস্টিন শ্রেণির পণ্য আমদানি করেছে চীন প্রায় ২২ কোটি ৩৯ লাখ কেজি। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি ২৪ লাখ কেজি। ভিয়েতনাম থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য।
বাংলাদেশের আম উৎপাদনের পরিমাণ বড় হলেও চীনের বাজারে রপ্তানি এখনও নগণ্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন। বিপরীতে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৯৪ টন। এর মধ্যে চীনে রপ্তানি হয়েছে খুবই সামান্য পরিমাণ। চীনে তাজা আম রপ্তানির আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি হয় ২০২৪ সালে। ওই বছরের ১০ জুলাই দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২৬ জুলাই চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস (জিএসিসি) নির্ধারিত উদ্ভিদ সংগনিরোধ শর্ত পূরণসাপেক্ষে বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম বাণিজ্যিক চালানে তিন টন আম চীনে পাঠানো হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে বাংলাদেশের আম রপ্তানি হয়েছে ৫ দশমিক ২২ টন। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭০০ কেজি।
গুয়াংজুর সানইউয়ানলি এলাকায় ব্যবসা করেন বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আম রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো মৌসুম। বাংলাদেশ ও চীনের আমের মৌসুমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আম বাজারে আসার সময় চীনের স্থানীয় আমও পাওয়া যায়। স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। কোন জাতের আমের চাহিদা বেশি, কোন আকার ও মানের ফল ক্রেতারা পছন্দ করেন, কত দামে বিক্রি করা সম্ভব এবং কোন সময়ে সরবরাহ করলে বেশি লাভ হবে– এসব বিবেচনা করে রপ্তানি পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমের ক্ষেত্রে আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংড়া কিংবা ফজলির মতো জাতের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলাদা বাজার তৈরি করা যায় কিনা, তা নিয়ে বাজারভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। তবে কোন জাত চীনের আমদানিকারকদের কাছে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, তা পরীক্ষামূলক চালান, ক্রেতাদের মতামত ও লাভ-ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে ফলের আকার, পরিপক্বতা, দাগমুক্ত অবস্থা, অবশিষ্ট কীটনাশকের মাত্রা এবং প্যাকেটের ভেতরে ফলের গুণমান একই রকম রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমের পাশাপাশি বাংলাদেশের কাঁঠালের জন্যও চীনের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত ২৭ জুলাই নির্ধারিত ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণসাপেক্ষে বাংলাদেশ থেকে তাজা কাঁঠাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে চীনের জিএসিসি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। আম ও কাঁঠালের পাশাপাশি পেয়ারা নিয়েও চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সানইউয়ানলির বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাংলাদেশের ফলের জন্য চীনে একাধিক বিপণন পথ তৈরি করা সম্ভব। তবে পণ্যের মান, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং ক্রেতার আস্থা অর্জন করতে হবে।
চীনের কৃষি গবেষণা ও গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান চায়নিজ একাডেমি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের পিএইচডি গবেষক সোলায়মান হোসেন বলেন, কোন দেশে কোন পণ্য পাঠালে লাভ হবে, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। এরপর গ্লোবাল গ্যাপ বা সংশ্লিষ্ট দেশের উত্তম কৃষিচর্চার মানদণ্ড অনুসরণ করে উৎপাদন করতে হবে। পণ্যের গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ঠিকভাবে অনুসরণ না করলে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান বলেন, বিভিন্ন দেশে ফল রপ্তানি বাড়াতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। চীনের সঙ্গে কী কী ফল রপ্তানি করা যায়, কীভাবে রপ্তানি করা সম্ভব এবং প্রতিবছর কতটুকু পাঠানো যেতে পারে, তা নিয়ে একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
আম রপ্তানি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হতে সময় লাগে। রপ্তানি বাড়াতে উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করে বাগান তৈরি এবং ফলের গুণমান উন্নত করা প্রয়োজন। এ ধরনের বাগানের পরিধি বাড়ানো গেলে আমসহ অন্যান্য ফল রপ্তানির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
- বিষয় :
- চীন