ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এলজিইডির সড়ক সংস্কারে অর্থ দিতে হবে ব্যবসায়ীদের

এলজিইডির সড়ক সংস্কারে অর্থ দিতে হবে ব্যবসায়ীদের
×

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪০

শুধু সরকারি অর্থায়ন নয়, গ্রামের বেহাল সড়ক সংস্কারে এখন থেকে ব্যবসায়ী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থও নেওয়া হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন সড়কগুলো সংস্কারে সরকার দেবে ৯০ শতাংশ অর্থ। বাকি অর্থ দেবে সংশ্নিষ্ট এলাকার ব্যবসায়ী ও বাস মালিকরা। প্রতিবছরই সড়ক সংস্কার খাতে টাকা দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। ব্যবসাভেদে ব্যবসায়ীদের টাকা নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এই অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। এমন বিধান রেখে সম্প্রতি এক বৈঠকে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নীতিমালা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব সমকালকে বলেন, বিদ্যমান সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে একটি নীতিমালা হচ্ছে। এটি প্রণয়নের পর এ নীতিমালা অনুযায়ী গ্রামীণ সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ হবে। এতে সড়ক সংস্কারের অর্থায়ন, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অগ্রাধিকারসহ নানা বিষয় থাকছে। এটি প্রণয়ন হলে সড়ক সংস্কার অনেক সহজ হবে।

সারাদেশে এলজিইডির আওতায় পাকা সড়ক রয়েছে ৮০ হাজার ৪৪৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে উপজেলা সড়ক ২৯ হাজার ৭৩৫ কি. মি., ইউনিয়ন সড়ক ২২ হাজার ১৮ কি. মি., গ্রাম সড়ক ক শ্রেণির ২০ হাজার ৯৫০ কি. মি. এবং খ শ্রেণির ৭ হাজার ৭৪৬ কি. মি.। এই সড়কগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কি. মি. সড়কের অবস্থা বেহাল- যার মধ্যে গ্রাম সড়কই বেশি। এ সড়কগুলো সংস্কারে বারবার এলজিইডি থেকে মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়া হলেও কাজ হচ্ছে না।

এদিকে, বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে সড়ক সংস্কারের ক্ষেত্রে বরাদ্দ খুব কম হওয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো সড়ক সংস্কারই হয়নি। বরাদ্দের বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে রাস্তার দু'পাশে মাটি ভরাট ও গাছের পরিচর্যায়। সড়ক সংস্কারে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাত্র ৫০৮ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ সালে ৬০০ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬২৫ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ উভয় সালেই ৬৫০ কোটি টাকা করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেওয়া হয়

৬৬০ কোটি টাকা করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর সরকারের প্রথম বরাদ্দকৃত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশই চলে গেছে রাস্তার দু'পাশে মাটি ভরাট এবং ছোট ছোট খানাখন্দ ভরাটে।

চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে মাত্র ২৫০ কোটি টাকা, যা দিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারই করা হয়নি। এতে রাস্তাগুলোর দশা বেহালই রয়েছে। এদিকে একশ্রেণির লোক এসব রাস্তা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে মানুষের চলাচল বিঘ্নিত করছে। কেউ কেউ রাস্তাজুড়ে ধান-পাট, খড়বিচালি, পাটখড়ি, কাঠের গুঁড়ি, ইট-বালু রেখে সেগুলোকে ব্যক্তিগত উঠোন বা সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। রাস্তার ওপর দোকানপাট তৈরি করায় এসব রাস্তা ক্রমান্বয়ে সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, নিকট অতীতে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে পাঁচ বছরের জন্য এমপিদের নামে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ এ অর্থ সড়ক সংস্কারের কাজে ব্যবহার করেননি। তারা গ্রামের কাঁচা সড়ক পাকা করার কাজ করেছেন। গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৫ হাজার কি. মি. কাঁচা সড়ক পাকা হলেও এক কি. মি. বিদ্যমান সড়কও সংস্কার হয়নি। এরই মধ্যে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪২০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। কিন্তু এর পূর্বশর্ত হিসেবে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছে। এ শর্তানুযায়ী আপাতত নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, বরং বিদ্যমান সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।

নীতিমালায় সড়ক সংস্কারে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ মেটাতে নতুন বিধানও আসছে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক এলাকার সড়ক সংস্কারে প্রতিবছর ওই এলাকার বাস মালিক এবং ব্যবসায়ী অর্থাৎ যারা ওই সড়কের সুবিধাভোগী, তাদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ অর্থ আদায় করা হবে। এ অর্থ আদায় করবে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। সড়ক সংস্কারের বাকি ৯০ শতাংশ অর্থ সরকার দেবে গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প থেকে। এ ছাড়া নীতিমালায় সড়কগুলোকে ঠিক রাখতে যানবহনে অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কে ৮ দশমিক ২ টন এবং গ্রাম সড়কে ৫ টন এক্সেল লোডের বেশি পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকছে।

নীতিমালায় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচিকে পরিবেশবান্ধব করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সড়কে মাটি ধস রোধ করা, সড়ক উন্নয়নে রোপিত বৃক্ষ কেটে না ফেলা, সড়কের নিচে পানি নিস্কাশন সুবিধা কার্যকর রাখাসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজে জেন্ডার সমতার লক্ষ্যে নারী শ্রমিক নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে এ নীতিমালায়। এ ছাড়া নীতিমালায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা বাড়াতে সেমিনারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো প্রকল্পের অধীনে সড়ক সংস্কার হয় না। সরকারের রাজস্ব বাজেটের অর্থ থেকেই এগুলো করতে হয়। কিন্তু এ বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় বড় ধরনের কোনো সংস্কার করা যাচ্ছে না। ফলে রাস্তাগুলো ভাঙাচোরা থেকে যাচ্ছে। এই রাস্তাগুলো ঠিক করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের সুযোগ রেখে এ নীতিমালা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×