ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকাল-মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গোলটেবিল বৈঠক

নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে কমবে সহিংসতা

নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে কমবে সহিংসতা
×

শনিবার সমকাল কার্যালয়ে 'জিডিপিতে নারীর কাজের অন্তর্ভুক্তিকরণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ১০:৪৪

ঘরে-বাইরে নারী এমন অনেক কাজ করেন, যার কোনো স্বীকৃতি নেই। অর্থনৈতিকভাবে কোনো মূল্যায়ন নেই। শুধু গৃহস্থালি নয়, নারীর উৎপাদনমুখী কাজও অনেক ক্ষেত্রে হিসাবে আসে না। পরিশোধ করা হয় না এমন কাজ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে আনা হলে অথবা অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করলে, সেগুলোর সামাজিক স্বীকৃতি বাড়বে, যা নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।

শনিবার দৈনিক সমকাল কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এমন মতামত দেন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সমকালের যৌথ আয়োজনে বৈঠকের আলোচনার বিষয় ছিল 'জিডিপিতে নারীর কাজের অন্তর্ভুক্তিকরণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ'। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, গণমাধ্যম কর্মী, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ও নারী অধিকার কর্মীরা।

সূচনা বক্তব্যে মুস্তাফিজ শফি বলেন, আমরা নানা দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছি না। নারীর কাজের স্বীকৃতি মিলছে না। ফলে তারা নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়েই যাচ্ছেন। সবাই মিলে কাজ করলে তাদের প্রতি সহিংসতা রোধ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও এর কাঙ্ক্ষিত সুফল নেই। ছুটি কাটিয়ে কর্মজীবী নারীরা কাজে ফিরলেও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর পরিবেশ পান না।

এ ধরনের ছুটির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। সরকারের দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, নারীর কাজের মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। তবু কোথায় যেন আমরা ঠেকে যাচ্ছি। ঘরে-বাইরে যদি নারীর মর্যাদা বাড়ে, তাহলে তার প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য কমবে। মর্যাদা বাড়াতে চাইলে নারীর সব অবদানের স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে পারিবারিক নির্যাতনের হার অনেক বেশি। এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আইনুল কবীর বলেন, গত তিন বছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে। এ অর্জন এমনি এমনি হয়নি। এখানে নারীর বড় অবদান রয়েছে। নারীর অপরিশোধিত কাজকে কীভাবে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কাজ করছে। নারীর মর্যাদা বাড়াতে সরকার তৎপর। তিনি আরও বলেন, জিডিপির সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতার যোগসূত্র এখানেই। নারীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ মূল্যায়নের আওতায় না আসায় তারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বেশি। তাই তাদের সব কাজকে বিবেচনায় আনতে হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সুলতানা রাজিয়া বলেন, নারীর কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্নে দৃশ্যমান কিছু করতে হবে। আজকাল দেখা যাচ্ছে, শুধু স্বামীর দ্বারা নয়, প্রতিবেশী, সহকর্মী এমনকি ভাইয়ের দ্বারাও নারী সহিংসতার শিকার। সহিংসতা কমাতে সরকারের পাশাপাশি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মায়ের মাথায় যখন ঢোকানো হয়, সন্তানকে ছয়টি টিকা দিলে সে সুরক্ষিত থাকবে, তখন তার মধ্যে উৎসাহ জাগে। অনেক কষ্টে হলেও সন্তানকে টিকা দিতে নিয়ে যান। এভাবে শুরু থেকে যদি নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. সাদেকা হালিম বলেন, রাজনীতিতে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, গুণগত মানে ততটা অগ্রগতি হয়নি। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারীর অবস্থান পরিস্কার নয়। মেয়েরা ক্ষমতাহীন বলেই ধর্ষণ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সহিংসতা রোধে আমাদের কাঠামোগত কাজ করতে হবে। নারীরা নির্দিষ্ট একটি গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক, তা যেন না হয়। বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে এসেছে সত্যি, কিন্তু নারীকে অধস্তনে রেখে দেশের সত্যিকারের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

আইনজীবী সালমা আলী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন হলে সবখানেই তার মর্যাদা বাড়বে। বস্তিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানকার মায়েরা তিন-চারটি বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করছেন। তার পরও তিনি কাজের স্বীকৃতি পান না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ভুক্তভোগী নারীর প্রতি সহমর্মী আচরণ দেখা যায় না।

বিষয়ের ওপর বিশ্নেষণ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, সরাসরি বাজারের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় নারীর বেশিরভাগ কাজ আলোচনায় আসে না। তাদের কাজের একটি মূল্যমান নির্ধারণ করতে হবে। আলাদা করে তাদের কাজের হিসাব রাখতে পারলে অর্থনীতিতে তাদের অবদান স্পষ্ট হবে। নারীর অপরিশোধিত কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত না করা গেলেও অন্তত তার মূল্যমান নির্ধারণ করে জিডিপির কত অংশ তা নির্ধারণ করতে পারে বিবিএস। যাতে নারীর অবদান সবাই বুঝতে পারেন। তিনি উল্লেখ করেন, সানেমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নারীর গৃহস্থালি কাজের মূল্য জিডিপির ৪০ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক সানজিদা আক্তার বলেন, এখনও আমরা 'গৃহিণী' শব্দটি ভাঙতে পারিনি। কেউ জানতে চাইলে 'স্ত্রী কিছুই করে না' বলার প্রবণতা থেকে গেছে। তরকারিতে লবণ কম হওয়ার সূত্র ধরেও সহিংসতা শুরু হয়। এ রকম মানসিকতা বজায় থাকলে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না। মর্যাদার মাধ্যমে সমতা গড়তে হবে। সবার আগে ব্যক্তি পর্যায়ে মানসিকতার বদল দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, নারীর কাজকে বিবেচনায় নেওয়ার ক্ষেত্রে যে মানসিকতা বিদ্যমান, তাতে এ মুহূর্তে খুব বেশি কিছু হবে তা আশা করা যায় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুব কম নারী আছেন, যারা বাইরে প্রচুর কাজ করে ঘরে ফিরে কাজ করেন না। তাদের মর্যাদার আসনে আনতে চাইলে পরিশোধিত-অপরিশোধিত সব ধরনের কাজকে মূল্যায়ন করতে হবে।

একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদক (কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড প্রোগ্রাম) মিথিলা ফারজানা বলেন, 'আমি সমতা চাই না, ন্যায্যতা চাই। আমাকে কোটার মধ্যে ফেলে প্রতিযোগিতায় রাখার প্রয়োজন নেই।' তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে, চাকরির ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ অনেক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে ফেরার পর নারীকে নানা বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পোশাক কারখানায় অনেক মেয়ে কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের কাজের পরিধি কমে আসছে।

জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এমবি আকতার বলেন, গ্রামের মেয়েরা শহরে আসতে চান কাজের জন্য, কিন্তু তাকে সংসার নিয়ে ভাবতে হয়। এ জন্য কলকারখানা গড়ার ক্ষেত্রে গ্রামকে প্রাধান্য দিলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অবদান আরও বাড়বে। এ ছাড়া পরিবারে কাজের সমতা নিশ্চিত না হলে শ্রমবাজারে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়বে না।

জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মঞ্জুন নাহার বলেন, পুরুষ ঘরের বাইরে ক্ষমতা আর রাজনীতির সঙ্গে থাকেন। গ্রামের নারী থাকেন হাঁড়ি-পাতিল আর গরু-ছাগল নিয়ে। শহরের নারী ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে সব কাজ সেরে চাকরিটা ধরতে হয় তাকে। ঘরের কাজ যথাযথভাবে করতে না পারলে তাকে নানা অপবাদ শুনতে হয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সোমা দত্ত বলেন, স্বীকৃতি যদি দিতে হয়, তাহলে মানসিকতায় পরিবর্তন একটি বড় ব্যাপার। নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই সহিংসতা হচ্ছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মাত্র ১৮ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক।

প্ল্যান বাংলাদেশের হেড অব ইনফ্লুয়েন্স কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হলেও কোনো তদারকি নেই। বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রসঙ্গ এলেই নারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সমাজে নারীর অবদান আলোচিত হয় না। ফলে ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই নারীর মধ্যে সহিংসতার ভয় কাজ করে। পদে পদে তাকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

সেন্টার ফর ল' অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সম্পাদক সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান নিরূপণের জন্য বিবিএসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অনেক অনুন্নত দেশেও নারীর গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন হয়। অথচ আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের সংবিধানে প্রণীত অনুচ্ছেদ অনুসরণ করেই নারীর ন্যায্য সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রকেই বড় ভূমিকা রাখতে হবে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সদস্য শিরিন আখতার বলেন, পরিবারকে যদি প্রতিষ্ঠান মনে করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের জন্য তার অবদান বাড়বে। ভারসাম্য থাকবে এমন একটি সমাজ নিয়ে আমাদের কথা বলা উচিত। তাহলে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে তার প্রতি সহিংসতাও কমে আসবে।

সমকালের বিজনেস এডিটর জাকির হোসেন বলেন, আইএফসির সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ কোম্পানিতে শিশু পরিচর্যার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়টি নারীর কাজের অন্তরায়। নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক খাতে তাদের কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি।

আরও পড়ুন

×