ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার

নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ১২:৫৯ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:২৫

নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার রাতে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ায় এ ঘোষণা দেন নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশরাফুল আলম। রাজধানীর পুরানা পল্টনে শ্রম ভবনে এ বৈঠক হয়।

বৈঠকে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক একেএম মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিকদের পক্ষে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন। 

বৈঠক শেষে আশরাফুল আলম সমকালকে বলেন, তাদের ১১ দফা মেনে নেওয়ায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে দাবি পূরণে গড়িমসি হলে আবারও কর্মসূচি দেবেন তারা।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য ভাতা নিয়ে বৈঠকে জটিলতা তৈরি হয়। সরকার চেয়েছিল আগামী বছরের মার্চ মাসে এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর শ্রমিকরা মার্চ মাস থেকেই খাদ্য ভাতা কার্যকরের দাবিতে অনড় ছিলেন। দু'পক্ষের আলোচনা শেষে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া হয়। এরপর রাতেই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।

নিয়োগপত্র, খোরাকিসহ ১১ দফা দাবিতে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ধর্মঘট শুরু করেছিল বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। এতে বন্ধ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩টি নৌপথে নৌযান চলাচল। ফলে দুর্ভোগে পড়েন লঞ্চসহ নৌপথের যাত্রীরা। ধর্মঘট সত্ত্বেও শনিবার সকালের দিকে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে কম দূরত্বে যাতায়াতকারী কিছু লঞ্চ ছেড়ে যায়। তবে দূরপাল্লার কোনো লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায়নি। দেশের অন্য জায়গা থেকে টার্মিনালে লঞ্চ এসে পৌঁছায়নি। দুপুরের পর থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়।

ধর্মঘটে দক্ষিণ জনপদের সব জেলা থেকে লঞ্চ চলাচল শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই বন্ধ ছিল বলে সমকালের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম ও মোংলাসহ কয়েকটি সমুদ্রবন্দরে জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজও ব্যাহত হয়েছে। শনিবার সদরঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, টার্মিনালের পন্টুনে কোনো লঞ্চ নেই। দূরপাল্লার ও স্বল্প দূরত্বের লঞ্চগুলোর বেশিরভাগ বুড়িগঙ্গা নদীর অপর প্রান্তে ভিড়িয়ে রাখা হয়। বেশিরভাগ লঞ্চের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। ঢাকার বাইরে থেকে এসে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর পরই সেগুলো নদীর মধ্যে নিয়ে ভিড়িয়ে রাখা হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।

কয়েকজন যাত্রী জানান, ধর্মঘটের কথা তাদের আগে থেকে জানা ছিল না। টার্মিনালে এসে লঞ্চ চলাচল বন্ধের কথা জানতে পারেন তারা। এতে তারা খুবই কষ্টের মধ্যে পড়েন। সাভার থেকে আসা রুহুল আমিন ও কেরানীগঞ্জ থেকে আসা সোবহান জানান, তারা পিরোজপুর জেলার তুষখালী যাবেন। কিন্তু ঘাটে আসার পর জানতে পারেন লঞ্চ ছাড়বে না।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম সমকালকে বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। লঞ্চ মালিকপক্ষ বারবার আশ্বাস দিলেও দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন করেনি। গত বুধবারের বৈঠক থেকেও তারা সুস্পষ্ট আশ্বাস পাননি। তাই শ্রমিকদের মতামতের ভিত্তিতে ধর্মঘট পালন শুরু করেন।

'কথায় কথায়' ধর্মঘটে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ: চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, দেশের ৭৫ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় নৌপথে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের বাণিজ্যও পুরোপুরি নির্ভরশীল নৌপথের ওপর। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই পথে কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকা হচ্ছে। গত এক বছরে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে চারবার ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। চার দিনের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় ধর্মঘট। এক পক্ষের দাবি পূরণ করার কয়েক দিনের মাথায় আরেক পক্ষ হাজির হচ্ছে নতুন দাবি নিয়ে।

নৌযান শ্রমিকরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বাস দিয়েও দাবি পূরণ না করায় তারা বারবার ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, কিছুদিন পরপর একেক পক্ষের একেক দাবি পূরণ করতে করতে তারা এখন ক্লান্ত। নৌপথ নিয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকায় সর্বনাশ হচ্ছে দেশের। বিদেশেও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজগুলোকে গত এক বছরে এমন ধর্মঘটের খেসারত গুনতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

শনিবার এক দিনেই চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা ৭৮টি বিদেশি জাহাজের প্রতিটিকে বাড়তি খরচ গুনতে হয়েছে আট লাখ টাকা করে। অলস সময় কাটাতে হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহনের দায়িত্বে থাকা এক হাজার ২০০ লাইটারেজ জাহাজকেও। আমদানিকারকরা বলছেন, কথায় কথায় এমন ধর্মঘট এই খাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এক দিনের ধর্মঘটে সৃষ্ট ক্ষতির জের টানতে হয় তাদের এক সপ্তাহ ধরে। এই অচলাবস্থার স্থায়ী সমাধান চান তারা। নেপথ্যে কারা, কেন এই নৌপথকে অস্থির করছে- তাও খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান ও চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, কারা-কেন এমনটি করছে, তা খুঁজে বের করা উচিত। সমস্যার মূলে গিয়ে বিষয়টির সমাধান হওয়া জরুরি। পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই ক্ষতির জের টানতে হচ্ছে দেশের ১৬ কোটি মানুষকেও।

নৌপথের অরাজকতা স্থায়ীভাবে দূর করতে গত ২৬ নভেম্বর নৌ প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছে চিটাগং চেম্বার। বারবার ধর্মঘট নৌপথের বাণিজ্যে কতটা ক্ষতি করছে, তা তুলে ধরা হয় চিঠিতে। এতে উল্লেখ করা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং শিল্পের আমদানিকৃত কাঁচামাল খালাস বন্ধ থাকলে একদিকে যেমন বাজার অস্থিতিশীল হবে, অন্যদিকে শিল্পমালিকরা যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে ব্যর্থ হবেন। ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের আর্থিক খরচও বেড়ে যাবে। এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে শ্রমিকদের এ ধরনের কর্মবিরতি অনাকাঙ্ক্ষিত। এটি অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

চিটাগং চেম্বার চিঠি পাঠানোর পর সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তখন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছিল নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। তবে সেই ধর্মঘট প্রত্যাহারের চার দিনের মাথায় আবার ধর্মঘট ডাকে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন।

আরও পড়ুন

×