ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাওরের কান্না

বাড়ছে দারিদ্র্য, হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত রূপ

বাড়ছে দারিদ্র্য, হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত রূপ
×

জাহিদুর রহমান, হাওরাঞ্চল থেকে ফিরে

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৪ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ২২:২৪

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের হাওরে। সেখানে কেটেছে তার শৈশব। ফেলে আসা স্মৃতি যেমন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, আবার চোখের সামনে বদলে যাওয়া হাওরের অবস্থা দেখে কষ্টও পান। সমকালের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, 'হাওরে গরুর সঙ্গে সখ্য ছিল, মাছের সঙ্গে প্রেম ছিল। সামান্য পানিতে বোয়াল মাছ চিকচিক করত। কত মাছ ধরেছি!'

মন্ত্রী হাওরের সোনালি অতীত তুলে ধরার পর আক্ষেপের সুরে বলেন, সেখানে অবিচারই সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। গরিবরা না খেয়ে থাকবে- এমন বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে। জেলেদের নামে জলমহাল ভোগ করে প্রভাবশালীরা। ভরা পানিতেও জেলেরা মাছ ধরতে পারে না, তারা ক্ষুধার্ত থাকে। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয় কৃষকদেরও। এখানে অন্যায়কে আইন দিয়ে ন্যায় বানানো হয়েছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, কিছু প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময় হয়েছে।

মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপের বেশ কিছুদিন আগেই এ প্রতিবেদক সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে হাওরের সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র  বৈশিষ্ট্য হারানোর গল্প শুনেছেন। কয়েক দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোথাও গানের আসর চোখে পড়েনি। অথচ এক সময় প্রতি রাতেই গ্রামে গ্রামে ঘটা করে আয়োজন হতো যাত্রা গান, বাউল গান, কীর্তন, মুর্শিদি ও ফকিরি গানের আসর। এখানেই জন্ম নিয়েছেন হাছন রাজা, রাধারমণ, উকিল মুনশি, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, শাহ আবদুল করিম, জালাল উদ্দীন খাঁ, রামকানাই দাশসহ প্রখ্যাত শিল্পীরা। হাওরের লিলুয়া বাতাস গায়ে মেখেই বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম লিখেছিলেন- 'আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!' সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের সন্তান শাহ আবদুল করিমের সেই গানের মতোই এখন হাওরের মানুষের জীবনেও সোনালি অতীত নিয়ে অনুশোচনা।

শাহ আবদুল করিমের প্রপৌত্র বাউল শিল্পী লাট মিয়া সমকালকে বলেন, 'অতীতের সেই সুন্দর দিন এখন নেই। আমার বড় বাবার (শাহ আবদুল করিম) গান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও আমাদের এখন দাম নেই। গান ছেড়ে এখন অন্য কাজ করে ভাত খাই। পুরো সুনামগঞ্জ থেকে আস্তে আস্তে গান উঠে যাচ্ছে।'

শাহ আবদুল করিমের একমাত্র ছেলে বাউল নূর জালাল বলেন, 'হাওরের গান সারাদেশে সমাদৃত। অথচ এ গান বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রতিটি মোবাইল অপারেটর আমার বাবার গান ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু কোনো রয়ালটি দেয় না। আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি।'

২০১৬ সালে 'গানপুর' নামে একটি লোকগানের দল প্রতিষ্ঠা করেন তাহিরপুরের স্থানীয় শিল্পী রূপম আকঞ্জী। তাদের বেশকিছু মৌলিক গানও রয়েছে। শুরুর দিকে পাড়ায় পাড়ায় গান পরিবেশন করলেও এখন তা নেই বললেই চলে। বর্তমানে পর্যটক ও এনজিওর কিছু অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে তারা কোনো রকমে টিকে আছেন। স্থানীয় মানুষের এখন গানের আসর জমানোর সামর্থ্য নেই জানিয়ে রূপম বলেন, 'এক সময় সোনালি ফসলের উৎসবে ভরে উঠত পুরো গ্রাম। বন্যায় ফসলহানি ও ধানের দাম না পেয়ে কৃষকের মনে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। ইজারাদারদের কারণে মাছও ধরতে পারে না জেলেরা। মানুষের পেটে ভাত না থাকলে গান শুনবে কী করে? সবদিকেই সমস্যা। তাই গান এখন কাউকে টানে না।'

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গুয়া শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পী তোসা মিয়া এক সময় পাড়ায় পাড়ায় গান গেয়ে সংসার চলাতেন। তবে গত কয়েক বছরে গ্রামে কোনো গানের আসর হয়নি বলে জানান এ শিল্পী। এ জন্য এলাকার মানুষের দারিদ্র্যকে দায়ী করে তিনি বলেন, 'গানের অনুষ্ঠান করতে টাকা লাগে। মানুষের পকেটে এখন টাকা নেই।'

হাওরের সংস্কৃতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষও যেন বদলে যাচ্ছে। ক্রমে সবাই যেন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। তাহিরপুর বাজারে বসে সেই কথা শোনালেন ষাটোধ্ব মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এক সময় দরজা খুলে ঘুমাতাম। অথচ এখন ঘরের বাইরে একটি বদনা রেখেও ঘুমাতে পারি না। চুরি-ডাকাতি বেড়েছে। অভাবের কারণেই মানুষ এমন অপরাধে ঝুঁকছে।

স্থানীয়রা জানান, বারবার ফসলহানি, ধানের দাম না পাওয়া, দুর্নীতি, কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতার অভাব, জলমহাল প্রভাবশালীদের দখলে থাকাসহ নানা বৈষম্যের কারণে হাওরে দারিদ্র্য বাড়ছে। আর কাজের সন্ধানে মানুষ ছুটছে শহরে। ফলে হাওরে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকট। তাহিরপুরের কৃষক সৈয়দ হক বলেন, 'হাওর এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় অন্য জায়গায় শ্রমিকরা কাজ করতে যায়। দুই-এক মাসের জন্য স্থায়ী কাজ বাদ দিয়ে ধান কাটতে আসতে চায় না তারা।'

সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের গত বছরের এক গবেষণায় হাওরের পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। তারা জানিয়েছে, হাওরে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, যা জাতীয় হারের চেয়ে বেশি। ২৬ শতাংশ কৃষক এখন হাওরের ৬৫ শতাংশ জমির মালিক। বাকি ৭৪ শতাংশ কৃষক বর্ষা মৌসুমে বেকার হয়ে পড়ে। এ হার বাড়তে থাকায় হাওরের কৃষক পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে।

ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের অন্য অঞ্চলে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও হাওর এলাকায় এই হার ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ। হাওরে কম ওজনের শিশুর হার ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারে খাদ্য সংকটের কারণে পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে শিশু।

বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে ৩৭৩টি হাওর রয়েছে। যার আয়তন প্রায় ৮৫৯ হাজার হেক্টর, যা হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোর মোট আয়তনের ৪৩ শতাংশ। এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সত্তরের দশকে হাওর বোর্ড গঠিত হয়েছিল। ১৯৮২ সালে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড' গঠন করেন। ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় এই বোর্ডকে 'অধিদপ্তর'-এ রূপান্তর করা হয়। ২০১২ সাল থেকে ২০৩২ পর্যন্ত হাওর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। চলতি বছরে হাওরবাসীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, মাথাপিছু আমিষ গ্রহণ বৃদ্ধি এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় চার বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ১২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আলী মুহম্মদ ওমর ফারুক বলেন, টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে হাওর এলাকার স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কোনোভাবেই পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। এসব কাজে স্থানীয় কমিউনিটিকে বেশি মাত্রায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না। হাওর অঞ্চলকে অর্থনৈতিক মুনাফা লাভের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি হাওরের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় হাওর কর্তৃপক্ষের জন্য একটি আইনের দাবি জানান।

হাওরের উন্নয়ন কৌশল ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

আরও পড়ুন

×