ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

যোদ্ধার চোখে

এই বাংলাদেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না

এই বাংলাদেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না
×

সবুজ ইউনুস

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:০৬ | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৩৪

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম শুধু একজন মেধাবী কর্মকর্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সম্মুখ সমরের অসমসাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা। সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে যেভাবে ভূমিকা পালন করেছেন, একইভাবে অস্ত্র হাতে মাঠে-ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের  বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন। এ জন্য তিনি অর্জন করেছেন বীরবিক্রম খেতাব।

সমকালের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ইতিহাসে দেখা যায় প্রত্যেকের জীবনেই কিছু স্মরণীয় সময় আসে। এটা আমার একটি সৌভাগ্য। বাংলার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই ভূমিকা পালনের সুযোগ এসেছিল। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, যুদ্ধে আমিও মারা যেতে পারতাম। লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। আমার অনেক সহকর্মী চোখের সামনে শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গু হয়েছেন। আমি ভাগ্যবান, এখনও বেঁচে আছি, সুস্থ-সবল আছি, জনগণের জন্য কাজ করে যেতে পারছি।

দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে তৌফিক-ই-ইলাহী জানান, স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হলো। ইতিহাস অন্যদিকে মোড় নিল। জিয়াউর রহমানের সময় থেকে দেশ পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণায় আক্রান্ত হলো। পাকিস্তানের সহযোগীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলো। এটা আমাদের মুখে একটি চড় মারার মতো ব্যাপার ছিল। স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ নষ্ট করা হলো। জয় বাংলা বলা যেত না। পরে '৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবার জয় বাংলা বলতে পারলাম। শুরু হলো নতুন যাত্রা। গত ১০-১২ বছরে সেই যাত্রা একটি স্থায়ী গতি পেয়েছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হবে। আগামী প্রজন্ম দেশকে অনেক দূর নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। এই বাংলাদেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। সরকারের লক্ষ্য, ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। আগামী বছরই অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ যাবে। সেই আলোয় আলোকিত হবে গোটা বাংলাদেশ। তিনি দৃঢ় চিত্তে বলেন, বাংলাদেশের এই উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ছিলেন মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) এসডিও বা সাব-ডিভিশনাল অফিসার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার গুরুত্ব সমধিক। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম শপথ অনুষ্ঠান এখানেই হয়। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন ও সমন্বয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেন তখনকার এই তরুণ বিদ্রোহী সরকারি কর্মকর্তা।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ৭৪ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা সমকালের এ প্রতিনিধিকে বলেছেন, '১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে বাংলাদেশের যে সরকার শপথ নিয়েছিল, সেটি কখনও প্রবাসী বা অস্থায়ী সরকার ছিল না। এটিই স্থায়ী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কনস্টিটিউশনাল (সাংবিধানিক) সরকার ছিল। এদিনই বাংলাদেশ আইনগতভাবে স্বাধীনতা অর্জন করে।' ঐতিহাসিক এ অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি করা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম।

শপথ অনুষ্ঠানের জন্য বৈদ্যনাথতলা বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, এই এলাকায় ছিল বিশাল আমবাগান। লোকজন ছিল খুবই কম। ওপর থেকে আক্রমণের আশঙ্কা কম ছিল। তার পরও কোনো আক্রমণ হলে মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সেদিন এ অনুষ্ঠানে জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদসহ আমাদের নেতারা এসেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান জনপ্রতিনিধি সৈয়দ ইউসুফ। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হয় তাজউদ্দীন আহমদকে। স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আমাকে বলেছিলেন, 'তুমিও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলে।'

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আন্দোলন সবাইকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করছিল। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সবকিছুর ওপরে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ছিলেন বিশাল বড় এক শক্তি। তার আগুনঝরা বক্তব্যে শরীরে রক্তের শিহরণ বয়ে যেত। শুধু আবেগ নয়, সেখানে ছিল যুক্তি। কারণ শুধু আবেগ দিয়ে সব হয় না, যদি যুক্তি না থাকে। বঙ্গবন্ধুর শক্তিতে সবাই বলীয়ান হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা নিয়ে লাহোরে ট্রেনিং অনুষ্ঠানে বিতর্ক করেছি। বাঙালির অধিকারের যে যুক্তি ছিল, তা নিয়ে একাডেমিতেও তর্ক হয়েছিল।

ড. তৌফিক-ই-ইলাহী জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনার জন্য তিনি মেহেরপুর থেকে ঢাকা চলে আসেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি জানতেন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি গুপ্তচররা আছে। এ জন্য তিনি টিএসসির এক কোনায় নিজেকে কিছুটা লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকেই তিনি শোনেন বঙ্গবন্ধুর সেই আগুনঝরা ঐতিহাসিক ভাষণ। 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তিনি বলেন, ওই বক্তব্যের পর আমাদের সামনে পরিস্কার হয়ে গেল চিত্রটা। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো। সবকিছুই বঙ্গবন্ধুর আদেশে চলতে থাকল। মেহেরপুরে ফিরলাম, ছাত্ররা কাছারিতে (আদালত ভবন) এসে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াল, আমি উৎসাহ দিলাম। সংগ্রাম পরিষদের মিছিল চলতে থাকল। মেহেরপুর ছোট শহর। বেশি মানুষ তখন ছিল না। তার পরও প্রতিদিন মিছিলে লোকের অভাব হতো না। জয় বাংলা স্লোগানে চারদিক মুখর হতে থাকল। ৭ মার্চের ভাষণ মানুষকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। মানুষের মনোবল চাঙ্গা হলো। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তখনই বুঝতে পারলাম পাকিস্তানিরা ক্র্যাকডাউন করতে পারে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ২৫ মার্চ শেষ রাতের দিকে থানা থেকে খবর এলো। বলল, স্যার ঢাকায় রাজারবাগের পুলিশ লাইনে আক্রমণ করেছে পাকিস্তানি আর্মিরা। ট্যাঙ্ক নিয়ে নেমে গেছে। সবকিছু ধ্বংস করে ফেলছে ওরা। মাঝরাতেই আমি শহরের চৌরাস্তায় এক টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে ছাত্রদের সমাবেশে প্রকাশ্যে একাত্ম ঘোষণা করলাম। জয় বাংলা স্লোগান দিলাম। তিনি বলেন, সে সময়ে সিএসপি অফিসাররা ছিলেন শিক্ষিত তরুণদের কাছে আদর্শ। সবাই তাদের সম্মান করতেন, অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন। সংগ্রাম পরিষদের ছেলেরা যখন দেখল এসডিও সাহেব রাস্তায় প্রকাশ্যে নেমে স্লোগান দিচ্ছেন, তখন তাদের মনোবল আরও চাঙ্গা হলো। এভাবেই সবাই সংগঠিত হতে থাকল।

সশস্ত্র একটি অপারেশনের বিবরণ দিয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী জানান, এর আগেই আমি আনসারদের ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। অস্ত্র, গোলাবারুদ কিছু দিয়েছি। এখানে ওই সময়ে আমাদের দু'জন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। একজন ছিলেন সৈয়দউদ্দীন সাহেব। তিনি হলেন বতর্মান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ সাহেবের বাবা।

ভোর হতেই দুই ভাগ করে দু'দিকে দু'দল পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এক দল কুষ্টিয়ার দিকে, অন্য দল চুয়াডাঙ্গার দিকে। মেহেরপুর থেকে মাত্র ১৮ মাইল দূরে ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট, পরবর্তীকালে বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) হেডকোয়ার্টার ছিল। যখন খবর পেলাম তারাও বিদ্রোহ করেছে, তখন আমরাও চলে গেলাম। ইপিআরের সঙ্গে একাত্ম হলাম। এদিকে চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (পরবর্তী সময়ে ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার), ক্যাপ্টেন আজম বিদ্রোহ করেছেন। ঝিনাইদহ থেকে এসপি মাহবুবও এলো। আমরা সবাই এক হলাম। পরিকল্পনা হলো কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি আর্মিদের কোয়ার্টারে আক্রমণ করা হবে। সেখানে পাকিস্তানি ২০০ সেনা ছিল। ২ এপ্র্রিল আক্রমণ করা হলো। সেখানে মাত্র একজন পাকিস্তানি সেনা ছাড়া সবাই মারা যায়। কিছু পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গ্রামের লোকেরা অনেকে দা-কুড়াল দিয়ে ওই পাকস্তানি সেনাদের কুপিয়ে হত্যা করে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সীমান্তে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২৬ মার্চ ভোর বেলা আমি চিঠি লিখলাম ভারতের কাছে। একটি খোলা চিঠি। ভারতের কাছে আমরা সাহায্য চাইলাম- আমাদের অস্ত্র, গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করার। তখন সীমান্তে বেশ চোরাকারবারি ছিল। তাদের ডেকে পাঠালাম। তাদের মাধ্যমে ভারত সীমান্তে সংবাদপত্র অফিসে ওই খোলা চিঠি পাঠালাম। পরের দিন দেখলাম, একটি খবরের কাগজের প্রথম পাতায় এ খবর ছেপেছে। এ খবর ভারতের ডিএম (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) বিএসএফ (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) তাদের কাছেও গেল। তখন তারা আমাকে ডেকে পাঠাল। মেহেরপুরের বেতাই সীমান্ত দিয়ে ওপারে গেলাম। সেখানে দেখা হলো একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সঙ্গে। পুরো নাম মনে নেই। তবে নামের পর চক্রবর্তী ছিল, এবং একজন ডিএমের সঙ্গে। তারা আমাকে রিসিভ করে বললেন, তুমি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত। আমাকে গার্ড অব অনার দিল তারা। আমি অস্ত্র, গোলাবারুদ চাইলাম। বললাম, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি। এরপর ওরা একটু সময় নিল। বলল, চেনখালি সীমান্তে দেখা করো। সেখানে কিছু গোলাবারুদ দিতে পারব।

এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে এসপি মাহবুবের সঙ্গে কথা হলো। আমরা বন্ধু। আমাকে বলল, 'তুই একটু আয়।' কারণ মাহবুব জানে, ভারতের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমি যোগাযোগ স্থাপন করেছি। মাহবুব একটি গাড়িতে এসে নামল। বলল, গাড়িতে একজন লোক আছে। পরিচয় করিয়ে দিল- উনি আমাদের নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। তাদের বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। আমি তখনও তাজউদ্দীন সাহেবকে ভালো করে চিনতাম না। এরপর একসঙ্গে সীমান্তে গেলাম। তখন ভারতীয় প্রতিনিধিরা জানতে চাইলেন তোমরা যুদ্ধ করবে, তোমাদের নেতা কে? বললাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জানতে চাইলেন, তিনি কোথায়? তখন কৌশলে বললাম, তিনি সময়মতো আত্মপ্রকাশ করবেন। তখন তারা বললেন, তোমাদের অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা নেই? বললাম, আমাদের সঙ্গেই আছেন। তখন তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামকে নিয়ে গেলাম তাদের সামনে। আমাদের কিছু অস্ত্র দিলেন- বিএসএফের কিছু লাইট মেশিনগান। তাজউদ্দীন সাহেবকে তারা অনেক সম্মান দিলেন। এরপর আমরা কলকাতার সঙ্গে টেলিফোন লাইনে যুক্ত হলাম। কুষ্টিয়া কয়েকদিনের জন্য মুক্ত এলাকা হলো। এরপর পাকিস্তানিরা কাউন্টার অ্যাটাক করে কুষ্টিয়া আবার দখলে নিল। আমরা পিছু হটলাম।

সে সময় বিদেশি কিছু মিডিয়া এসেছিল আমাদের কাছে। তারা জানতে চাইল- তোমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছ। তোমাদের সরকার কই? তখন একটি নির্দেশনা এলো- মেহেরপুরের একটি জায়গা পরিস্কার করো। তখন আমরা (আমি ও মাহবুব) ওই জায়গা রেকি করলাম। কার নির্দেশে সেটি মনে নেই; তবে বুঝলাম, এখানে আমাদের কোনো নেতার নির্দেশনা আছে। ভারতের সহযোগিতা আছে। সেটিই হলো ঐতিহাসিক বৈদ্যনাথতলা। ভারত সীমান্তের কাছে, যোগাযোগ ভালো ছিল না। পাকিস্তানি আর্মি সহজে এখানে আক্রমণ করতে পারবে না। এরপর সেখানে কিছু টেবিল-চেয়ার আনা হলো। জাতীয় সংগীত গাইতে হবে। পতাকা লাগবে। লোক লাগবে। সেখানে তেমন লোকও নেই। তবুও এসবের ব্যবস্থা করা হলো।

এরপর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৭ এপ্রিল। একসঙ্গে ৫০টি গাড়িবহর নিয়ে আমাদের নেতারা এলেন। বিদেশি সাংবাদিক, টেলিভিশন, মিডিয়া আরও অনেকে। ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান হলো। এক ঘণ্টার মতো। সৈয়দ ইউসুফ শপথ পড়ালেন। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন। ঘোষণায় বলা হলো, কেন আমরা সরকার করলাম। এর আইনগত ভিত্তি তুলে ধরা হলো। এসপি মাহবুব আমাদের নবনির্বাচিত সরকারকে গার্ড অব অনার দিলেন।

সরকার গঠনের পর আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো আমি কী করব। তখন আমি সশস্ত্র যুদ্ধে থাকার কথা জানালাম। আমাকে সাব-সেক্টর কমান্ডার করা হলো। র‌্যাঙ্ক দেওয়া হলো ক্যাপ্টেন। এটা ৮ নম্বর সেক্টর ছিল। মেজর ওসমান প্রথম কমান্ডার ছিলেন। পরে ছিলেন মেজর এম. এ মনজুর, যিনি পরবর্তী সময়ে জেনারেল হন।

ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বীরবিক্রমের জন্ম ১৯৪৫ সালে সিলেটে। তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো এবং হার্ভার্ডের টিচিং ফেলো। তৌফিক-ই-ইলাহীর স্ত্রী বেগম আসমা তৌফিক। তিনি কবি জসীমউদ্‌দীনের বড় মেয়ে।

কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। এরপর সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০২ সালে তিনি অবসরে যান।

২০০৯ সাল থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

আরও পড়ুন

×