ধর্ষকের ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১০:৩৫
রাজধানীর কুর্মিটোলায় শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনার পর দিন থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, প্রতিবাদী চিত্রাঙ্কন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ধর্ষক গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে মজনু নামের ওই ধর্ষক গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে ঘটনার তৃতীয় দিনও তারা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন।
বুধবার দিনভর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবাদে শামিল হন শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মানববন্ধন-সমাবেশে সবার দাবি ছিল একটাই- ধর্ষককে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দিতে হবে।
সমকালের ব্যুরো অফিস, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বলা হয়, একই দাবিতে রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পাবনা, নওগাঁ, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। এই কর্মসূচি থেকে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মানববন্ধনে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূইয়া, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন সানজিদা আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানে আইনি কাঠামোর মধ্যে কোথাও ঘাটতি থাকলে তাও খতিয়ে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্যাতিত ছাত্রীর পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা করবে।
অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এ ঘটনা প্রমাণ করে দেশের প্রশাসন কতটুকু দায়িত্বজ্ঞানহীন। দেশের একটি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে মফস্বলের মেয়েরা কোন অবস্থায় আছে তা প্রমাণিত হয়। ধর্ষক আর রাজাকারের কোনো পার্থক্য নেই। যদি রাজাকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে ফাঁসি হয় তাহলে ধর্ষকেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।
অন্য বক্তারাও ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করেন।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে নারী সমাবেশ করেন ঢাবির নারী শিক্ষার্থীরা। তারা ধর্ষককে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একইসঙ্গে নারীর নিরাপত্তায় আট দাবি উপস্থাপন করেন।
সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ নারী হলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ ছাড়াও সমাবেশে সংহতি জানিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা, সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজলী সেহরীন ইসলাম, লেকচারার মার্জিয়া রহমান, শামসুন্নাহার হল সংসদের সহসভাপতি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি প্রমুখ বক্তব্য দেন।
অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, 'প্রতিনিয়ত আমরা ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে দেখতে পাই। কিন্তু তার সুষ্ঠু বিচার পাই না। ধর্ষণের মতো এ ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মনোভাব ও চলমান সংস্কৃতি সমানভাবে দায়ী। অবিলম্বে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।'
অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, 'সন্তানতুল্য ওই শিক্ষার্থীর সাহসের প্রশংসা করতে হয়। তার সাহস, আত্মবিশ্বাস নারীসমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। আমাদের বিভক্ত হলে চলবে না। ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে জাগতে হবে। অন্যথায় দাবি আদায় করা সম্ভব নয়।'
সামিনা লুৎফা বলেন, 'দেশে প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে, সেগুলো আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। আমাদের সেই ছাত্রীর মতো সব ভুক্তভোগী নারী যদি ধর্ষকের শাস্তি চাইতো তাহলে ধর্ষকরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারত না।'
সমাবেশে উপস্থাপিত আট দাবি হলো- ধর্ষণের দ্রুত বিচারে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন; সব আদালতে নারী নিপীড়ন সেল গঠন করে এক বছরের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার; টিএসসি থেকে সুফিয়া কামাল হল, গণতন্ত্র তোরণ থেকে সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট পর্যন্ত ল্যাম্পপোস্ট ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন; বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নিজস্ব ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শ করার জন্য ৪-৫ জন নারী শিক্ষক দিয়ে নারী উপদেষ্টা নিয়োগ; বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীশিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন; ক্যাম্পাস থেকে ভবঘুরে, নেশাখোর ও পাগলদের অপসারণ; ক্যাম্পাসের বাস স্টপেজগুলোর নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনা করা এবং ইমার্জেন্সিতে অনাবাসিক ছাত্রীদের হলে অবস্থান করার অনুমতি।
এ ছাড়াও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় ডাকসু। 'নিপীড়নবিরোধী ডাকসু মঞ্চ' থেকে ধারাবাহিক এই প্রতিবাদ জানানো হয়। এ ছাড়াও ইতিহাস বিভাগের আয়োজনে অপরাজেয় বাংলায় মানববন্ধন, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। সেখান থেকে জনসমক্ষে ধর্ষকের ফাঁসির দাবি জানানো হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ
রাজশাহী: ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ ও গোদাগাড়ীতে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে রাজশাহী কলেজে মানববন্ধন করেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার সকাল ১১টায় কলেজের প্রশাসন ভবনের সামনে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানান। বক্তব্য দেন রাজশাহী কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক আনিসুর রহমান, শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন, সাব্বির হোসেন, জাহিদ হাসান, হাফিজা আক্তার হাসি, মরিয়ম নেসা লিমা প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জ: ঢাবি ছাত্রীর ধর্ষককে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, সারাদেশে নারীর ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে প্রগতিশীল ছাত্রজোট সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। সকালে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। প্রগতিশীল ছাত্রজোটের জেলা সমন্বয়ক সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি সুলতানা আক্তারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলা সংসদের সভাপতি শুভ বণিক, সাধারণ সম্পাদক ইবনে সানি দেওয়ান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসাইন, অর্থ সম্পাদক মুন্নি সর্দার, ছাত্র ইউনিয়নের জেলার শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পরমা চিত্র ঘোষ প্রমুখ।
বরিশাল: একই দাবিতে বিএম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানারে বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। সকাল ১১টায় কলেজের জিরো পয়েন্ট থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে মানববন্ধন করা হয়।
পাবনা: পাবনায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকালে পাবনা শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে এই কর্মসূচি পালন করেন সচেতন পাবনাবাসী ও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১১টায় পাবনা সেন্ট্রাল গার্লস হাইস্কুলের সামনে ও পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে ইয়েস ফাউন্ডেশন ও সচেতন ছাত্রসমাজ মানববন্ধন করে।
নেত্রকোনা: ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে জেলা সদরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। জেলা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় প্রধান সড়কে সম্মিলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ব্যানারে সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এ মানববন্ধন পালিত হয়। এতে বক্তব্য দেন স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক বেগম রোকেয়া, নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামলেন্দু পাল, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তাহেজা বেগম এ্যানি প্রমুখ।
নওগাঁ: ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে দুপুরে নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে স্বাধীনতা ভাস্কর্য চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ নওগাঁ শাখা। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনের সমন্বয়ক রকি সরকার, কলেজ শিক্ষার্থী তনুশ্রী নন্দি, সুরাইয়া জামান, মোস্তাইন বিল্লাহ প্রমুখ।
- বিষয় :
- ধর্ষণ
- ধর্ষকের শাস্তি
- ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ
