ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকারে ডিএনসিসি মেয়র প্রার্থী

তারুণ্যের মেধাশক্তি দিয়ে আধুনিক ঢাকা গড়ে তুলব- তাবিথ আউয়াল

তারুণ্যের মেধাশক্তি দিয়ে আধুনিক ঢাকা গড়ে তুলব- তাবিথ আউয়াল
×

লোটন একরাম

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:০০

বিজয়ী হলে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএন-সিসি) নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। মশা, জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণের মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমস্যা সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন তিনি।

তাবিথ আউয়াল চাইছেন তরুণদের অদম্য চেতনা কাজে লাগিয়ে মেধা-বুদ্ধিমত্তা ও প্রাণশক্তির সাহায্যে আধুনিক বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে। 'দুঃশাসন-দুর্নীতি প্রতিরোধে আপস করবে না ঢাকাবাসী'- এই স্লোগান নিয়ে এবার ভোটযুদ্ধে লড়বেন তিনি। অবশ্য নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তার। ইভিএমে ভোট গ্রহণে কারচুপির আশঙ্কা করেছেন তিনি। আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে  রেখে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তাবিথ আউয়াল এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার গুলশানে নিজের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নগর উন্নয়ন ও নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে খোলামেলা অনেক প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। তবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম সম্পর্কে সরাসরি মূল্যায়ন করতে তিনি রাজি হননি। শুধু বলেছেন, জনগণই তাকে মূল্যায়ন করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসা প্রশাসন ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন তাবিথ আউয়াল। দেশে ফিরে তিনি যুক্ত হন পৈতৃক ব্যবসার সঙ্গে। তার বাবা এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রথম প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আসেন তাবিথ আউয়াল। অবশ্য ভোটের দিন দুপুরেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনিসুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। তবে প্রচার ও পরিকল্পনায় তরুণ প্রার্থী হিসেবে সেবারই সাড়া ফেলেছিলেন তাবিথ। বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দলের আন্তর্জাতিক উইংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি।

মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপি তাকে বেছে নিল কেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল বলেন, দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। বিএনপি চায়, আধুনিক ঢাকা গড়তে তরুণদের থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসুক। তারাই পারবে মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঢাকাকে বাসযোগ্য করার নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে। কেননা, তরুণরা অধিকার আদায়ে অটল, অসহায়ের জন্য সহানুভূতিশীল ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অবিচল। তারুণ্যের চেতনায় একটি আধুনিক ঢাকা গড়ে তুলতেই তাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে বিএনপি। তিনি ইতোমধ্যে 'অদম্য ঢাকা' নামে নানাবিধ সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার জন্য একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মও গঠন করেছেন।

মেয়র পদে জয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাবিথ আউয়াল বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

জয়লাভের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?- এ প্রশ্নের জবাবে তাবিথ বলেন, দুঃশাসন ও দুর্নীতিকে মোকাবিলা করতে হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে। কাউন্সিলর প্রার্থী এবং নেতাকর্মীদের ওপর নানা কায়দায় ভয়ভীতি ও জুলুম-নির্যাতন শুরু হয়েছে। ইভিএম পদ্ধতি বাতিল করে ভীতিমুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করাই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ।

ভোটাররা কেন তাকে ভোট দেবেন, জানতে চাইলে এই তরুণ প্রার্থী বলেন, ভোটাররা তাকে ২০১৫ সালের ঢাকা সিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু সরকার হস্তক্ষেপ করে তা ছিনিয়ে নিয়েছে। ভোটাররা যাকে তখন সমর্থন দিয়েছিলেন- এবারও সেই আসল ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার জন্য অপেক্ষা করছেন।

তাবিথ আউয়াল বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অনেক শঙ্কা আছে। বিশেষ করে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা বিশ্বাস করতে দেয় না যে, এখন নির্বাচনের কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে এসেছে।

নির্বাচনের ফলাফল নিজের অনুকূলে আনতে প্রস্তুতি কেমন? এমন প্রশ্নের জবাবে তাবিথ বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। দলের অভিজ্ঞ ও সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে নির্বাচন পরিচালনা করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সুচারুভাবে নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কর্মীদের উজ্জীবিত করা হচ্ছে। দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনের প্রতিনিধিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে তারাও কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়াকেও কাজে লাগাচ্ছি।

নির্বাচনের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বলা হলে অপারগতা প্রকাশ করেন তাবিথ আউয়াল। তিনি বলেন, সাধারণ ভোটাররাই তার মূল্যায়ন করবেন। তিনি কতটুকু সফল, কতটুকু ব্যর্থ- তা জানি না। তবে এই শহরের অবস্থা সম্পর্কে এটুকু বলা যায়, প্রিয় আধুনিক শহরটি সত্যিকার অর্থেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। এটা একজনের ব্যর্থতা নাকি তার রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতা- তাও জানি না। এ পরিস্থিতিতে চাইছি, নিজে শহরের দায়িত্ব নিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ করে বসবাসের যোগ্য করে তুলতে।

গত নির্বাচনে তাবিথ আউয়ালের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। তার কার্যক্রম সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, আনিসুল হক একটি কাজ করেছেন- তার কথা ও কাজে সাধারণ জনগণের কাছে সিটি করপোরেশনকে বিশ্বাসের জায়গায় ফিরিয়ে এনেছেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন চাইলে সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারে, এই বিশ্বাসের জায়গাটা আবার যাতে হারিয়ে না যায়- নির্বাচনে জিতলে সে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

ইভিএম নিয়ে দলের মতো তারও কোনো শঙ্কা আছে কিনা? - এ প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল বলেন, পৃথিবীর ২০০ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে শুধু চারটি দেশে ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হয়। তাও আংশিকভাবে। তাতে সব তথ্য পরিস্কার ভাষায় পাবলিক ডোমিনে আছে। আমাদের মেশিনগুলোর সফটওয়্যার কে বা কারা তৈরি করেছে এবং ভেতরে কী আছে? কমিশনকে বারবার প্রশ্ন করলেও কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। আমরা ১-২টা মেশিন পরীক্ষা করেই বা লাভ কী? হাজার হাজার মেশিনের ভেতর কে পরীক্ষা করবে?

বিজয়ী হলে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে তাবিথ বলেন, প্রথমেই গুরুত্ব দেব মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে। এছাড়া যানজট, জলাবদ্ধতা, খাবার পানির সংকট, বায়ুদূষণ ইত্যাদি সমাধানের উদ্যোগও নেব। এগুলোর কোনো কোনটির সমাধানের প্রশাসনিক ক্ষমতা সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। সে ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

পৃথিবীর উন্নত কোন সিটির আদলে ঢাকা সিটিকে গড়তে চান?- এ প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বলেন, বর্তমান সরকার ঢাকা শহরকে ক্যাসিনোর শহর 'লাস ভেগাস' বানিয়েছে। অথচ ঢাকার ৪০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। ঢাকাকে আধুনিক বাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে চাই। তার নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চাই।

নির্বাচনের ইশতেহারে স্লোগান কী হবে এবং কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে?- এমন প্রশ্নের জবাবে ধানের শীষের প্রার্থী বলেন, এবারের স্লোগান হচ্ছে- 'দুঃশাসন দুর্নীতির প্রতিরোধে আপস করবে না ঢাকাবাসী'। দুঃশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়টিই ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে। নির্বাচনে কারচুপি ও ভোটবর্জন নিয়ে নানা জনের নানা মত সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, গতবারের পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী পরিবেশ বিবেচনা করলে সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন এবং আমরা জেনেশুনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। গণতন্ত্র রক্ষা ও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে একটা বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে অংশ নিচ্ছি এবং শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকব।

পানামা পেপার কেলেঙ্কারি মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নড়েচড়ে বসছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ সব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুদকের অনুসন্ধানাধীন কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়- এটা আইনে বলা আছে। আর নির্বাচনে নামলে কিছু আলোচনা-সমালোচনা তো হবেই।

আরও পড়ুন

×