উচ্চবিত্তদের তথ্য সংগ্রহ করে ডলারে চাঁদা চাইত চক্রটি: ডিবি
দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা
গ্রেপ্তার সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিব
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩০ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৪২
সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য-বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, চলাফেরা ও আর্থিক বিষয়-সংগ্রহ করত চক্রটি। পরে তাদের কাছে ডলারে চাঁদা দাবি করত। চাঁদা না দেওয়ায় আসাদুর রহমানের ওপর হামলা করা হয়। এই চাঁদা না দেওয়ায় অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হক ও অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। রোববার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, হামলার মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগ। সাত সদস্যের এই চক্রের চারজন এখন গ্রেপ্তার। ডা. এ কে এম আমিনুল হক ও ডা. আসাদুর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের জন্য চক্রটি সানি নামে একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিল। হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য সদস্য সংগ্রহের দায়িত্ব ফাতিন ইসরাক লাবিবকে দেন সানি।
সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল ইসলাম বলেন, একটি চক্র সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালের অন্তত পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে টার্গেট করেছিল। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড–নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমান ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক ছিলেন। চক্রটি চিকিৎসকদের কাছে ডলারে চাঁদা দাবি করত। চাঁদা না দেওয়ায় আসাদুর রহমানের ওপর হামলা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে পাঁচজন দুষ্কৃতকারী গাড়ি আটকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হককে হুমকি দেয়। এরপর গত ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে বাসায় ফেরার পথে হামলার শিকার হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান।
পুলিশ জানায়, চিকিৎসককে বহনকারী সিএনজির গতিরোধ করে হামলাকারীরা। এর কারণ জানতে চাইলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে চিকিৎসককে সিএনজি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জীবন ওরফে আদিল চিকিৎসকের ডান চোখে গুরুতর আঘাত করে। অন্যরা তার মাথা, দুই চোখের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এ সময় তাকে ভয়ভীতি ও হুমকিও দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ডা. আসাদুর রহমান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় জীবন ওরফে আদিলসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার কিছুদিন আগে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে চিকিৎসকের মোবাইলে ফোন করে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও তদন্ত শুরু করে ডিবি। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে শনির আখড়ার গোয়ালপাড়া এলাকা থেকে সানি সাহাকে এবং খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে সানি সাহা জানিয়েছেন, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সময় ২০২৩ সালে জান্নাত আলমগীর হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে আলমগীর তাকে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রস্তাব দেন। এতে বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েন সানি। পরে তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে ডিবি জানিয়েছে।
ডিবি আরও জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে ফিরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জান্নাত আলমগীরের সঙ্গে দেখা করেন সানি। এ সময় সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য-বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, চলাফেরা ও আর্থিক বিষয়-সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। পরে ডা. এ কে এম আমিনুল হক ও ডা. আসাদুর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের জন্য সানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য সদস্য সংগ্রহের দায়িত্ব ফাতিন ইসরাক লাবিবকে দেন সানি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদে ফাতিন ইসরাক লাবিব জানান, ঘটনার প্রায় আড়াই মাস আগে ফুড ডেলিভারির মাধ্যমে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী সানি সাহার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের কয়েক দিন পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের সরাসরি দেখা হয়।
পরে ডা. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য আবু বকর (১৮), রাতুল (১৯), ইবান (২২), জীবন (২১) ও সাব্বিরকে (১৮) এক লাখ টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গে কাজ করতে বলেন ফাতিন।
ডিবি জানায়, এ ঘটনায় ইবান ও জীবনকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রেপ্তার সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিবের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে।