ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দীর্ঘ পথচলায় প্রতিটি চরিত্র আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে: সুষমা

দীর্ঘ পথচলায় প্রতিটি চরিত্র আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে: সুষমা
×

সুষমা সরকার

মীর সামী

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:০১ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:১৯

সুষমা সরকার। দর্শকপ্রিয় এ অভিনেত্রী দুই যুগ ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন। আজ সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটারে রয়েছে তাঁর একক অভিনীত নাটক ‘পারো’-এর ১৬তম মঞ্চায়ন। মাসুম রেজার রচনা ও নির্দেশনার এই নাটক ও অন্যান্য প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মীর সামী

আজ ‘পারো’ নাটকের ১৬তম মঞ্চায়ন হবে। নাটকটি নিয়ে কিছু বলুন?
পারমিতা নামের এক নারীর মনোজগতের দ্বৈত সত্তা উপস্থাপিত হয়েছে ‘পারো’ নাটকে। একদিকে পারমিতা প্রতিবাদী, অন্যদিকে তার মনের ভেতর জেগে ওঠে আপসকামিতা। বিপরীতমুখী এই দুই সত্তার দ্বন্দ্বে পারমিতার মধ্যে মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নিজের সঙ্গেই নিজের বিরোধ তৈরি হয়; জীবনে নেমে আসে নানা টানাপোড়েন। এভাবেই এগিয়ে যায় নাটকের কাহিনি।

এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ‘পারো’ নাটকে একাই সাতটি আলাদা চরিত্রে অভিনয় করেন। এতগুলো চরিত্র একসঙ্গে ধারণ করা শারীরিক ও মানসিকভাবে কতটা কঠিন?
একসঙ্গে সাতটি চরিত্র ধারণ করা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। কাজটি করতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। ‘পারো’তে আমার দুটি সত্তা রয়েছে। তাছাড়া বাকি চরিত্রগুলো পুরুষ। তাই নাটকটির মহড়া শুরুর আগে থেকেই চারপাশের মানুষদের খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করি। বিশেষ করে পুরুষদের। তাদের অভিব্যক্তি, চলাফেরা, কথা বলার ধরন–এসব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে এই পর্যবেক্ষণ আমার অনেক কাজে দিয়েছে।

একক অভিনয়ে মঞ্চে সহ-অভিনেতা না থাকায় দর্শকের প্রতিক্রিয়াই তো আপনার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। দর্শকের সঙ্গে এই সরাসরি যোগাযোগ কতটা উপভোগ করেন?
মঞ্চনাটকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো দর্শকের সম্পৃক্ততা। যেহেতু এই নাটকে আমি একাই অভিনয় করি, আমার কোনো সহ-অভিনেতা নেই। অভিনয় করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে আমি ভুলেই যাই যে সামনে দর্শকরা আছেন। কারণ নাটক শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা এতটাই নিমগ্ন থাকেন তাদের উপস্থিতি আলাদাভাবে টের পাই না। নাটক শেষে অনেকেই আমাকে বলেছেন, নাটক চলাকালে তাদের পাশে কে বসেছেন, সেটাও তারা খেয়াল করেননি। দর্শকের এই ভালোবাসা ও সম্পৃক্ততা আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে।

‘পারো’ করতে গিয়ে অভিনয়ের এমন কোনো নতুন দিক আবিষ্কার করেছেন, যা আগে নিজের মধ্যে খুঁজে পাননি?
‘পারো’ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, আমার নিজের ভেতরেও কতগুলো চরিত্র লুকিয়ে আছে। পারমিতার মধ্য দিয়ে সেই জায়গাগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। আমার কাছে মনে হয় নাটকটি আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়। কারণ আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এক ধরনের দ্বৈত সত্তা কাজ করে। একদিকে আমরা যা হতে চাই, অন্যদিকে বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের অন্য পথে নিয়ে যায়। নিজের সঙ্গে নিজের এই যে লড়াই, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। চরিত্রটির আবেগ, দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে নিজেকেও নতুনভাবে চিনেছি।

নাটকটির বিভিন্ন প্রদর্শনীতে দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আপনাকে স্পর্শ করেছে, সেটি কী?
দর্শকদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে নাটকটি দেখা আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। এমনও হয়েছে, শো শেষে বিশেষ করে নারী দর্শকরা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন; অনেকক্ষণ কথা বলেছেন। তাদের অনেকের মধ্যেই পারমিতার নানা দিক খুঁজে পেয়েছি। মনে হয়েছে, চরিত্রটির অনুভূতি ও টানাপোড়েন তাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গেও কোথাও না কোথাও মিলে গেছে। প্রথম দিকের শোগুলোর কথা এখনও মনে আছে। নাটক শেষ হওয়ার পর অনেক দর্শক অনেকক্ষণ কেঁদেছেন; আবেগে কিছু বলতেও পারেননি। দর্শকের এই ভালোবাসা ও তাদের অনুভূতির জায়গায় পৌঁছাতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এবং অনুপ্রেরণা।

কখনও কি মনে হয়েছে, একক অভিনয় দলগত অভিনয়ের চেয়েও বেশি কঠিন?
অবশ্যই। একক নাটকে অভিনয় অনেক কঠিন, একই সঙ্গে অনেক বেশি দায়িত্বেরও। দলগত অভিনয়ে পুরো নাটকের দায়িত্ব একজনের কাঁধে থাকে না। কিন্তু একক নাটকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো গল্প, চরিত্র ও আবেগ–সবকিছুর দায়িত্বই একজন অভিনয়শিল্পীকে নিতে হয়। ভালো হলে পুরো কৃতিত্ব যেমন পাওয়া যায়, তেমনি কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তার দায়ও পুরোপুরি অভিনয়শিল্পীর ওপর পড়ে। তাই একক অভিনয়ে দায়িত্ব যেমন বেশি, চাপও তেমন বেশি।

দুই যুগের অভিনয়জীবনে আপনি মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমা–তিন মাধ্যমেই কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ পথচলায় অভিনয় সম্পর্কে আপনার ধারণা কতটা বদলেছে?
সময় যেমন বদলায়, আমাদের জীবনযাপন ও দৃষ্টিভঙ্গিও তেমন বদলে যায়। আগে যেটাকে ঠিক মনে হতো, সময়ের সঙ্গে কখনও কখনও মনে হয় সেটি হয়তো সঠিক ছিল না। অভিনয়ের ক্ষেত্রেও আমার অভিজ্ঞতা অনেকটা এমনই। দীর্ঘ এই পথচলায় প্রতিটি চরিত্র আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে, নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এখনও প্রতিনিয়ত শিখছি, জানছি। প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে নতুন করে যাত্রা করতে ভালো লাগে। চেষ্টা করি, একই ধরনের অভিনয়ের মধ্যে আটকে না থেকে প্রতিটি চরিত্রকে ভিন্ন মাত্রায় তুলে ধরতে।

শুরুর দিকের সুষমা আর এখনকার সুষমার মধ্যে অভিনেত্রী হিসেবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায়?
শুরুর দিকে শখের বশেই অভিনয়ে এসেছিলাম। তখন অভিনয় ছিল ভালো লাগা, আনন্দ আর নতুন কিছু করার একটা সুযোগ। সময়ের সঙ্গে সেই শখই আমার পেশা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অভিনয়ের প্রতি আমার দায়িত্ববোধও বেড়েছে। এখন একটা চরিত্র হাতে নিলে শুধু সংলাপ বলা বা চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি না; চরিত্রটির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি, তার মনোজগৎটা বোঝার চেষ্টা করি। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বোধহয় এখানেই। অভিনয় এখন আমার কাছে শুধু পেশা নয়, নেশাও। প্রতিটি নতুন চরিত্র আমাকে নতুন কিছু শেখায়; নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাই এত বছর পরও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বা কৌতূহল একটুও কমেনি।

আরও পড়ুন

×