কাগজের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ‘সিন্ডিকেট’, আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার দাবি
ছবি : সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২২ | ০৮:৫৭ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২২ | ০৯:৩১
বাজারে কাগজের মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যায়িত করে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতারা বলছেন, এর পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা মজুতদারি করছে। বাজারকে প্রভাবিত করে তারা মুনাফা লুটছে। অবিলম্বে কাগজের দাম না কমালে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব ধরণের প্রকাশনা শিল্পে। এমনকি আগামী বইমেলায়ও। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা কাগজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানান।
মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি জানিয়েছেন ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’র নেতারা। এতে লিখিত বক্তব্যে সমিতির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন ছোটন বলেন, ‘২০২১ সালে যেখানে ৮০ গ্রাম ডিডি অফসেট কাগজের দাম ছিল এক হাজার ৫০০ টাকা রিম, এখন তার দাম তিন হাজার টাকার বেশি। ১০০ গ্রামের একই কাগজের যেখানে ২০২১ সালে দাম ছিল এক হাজার ৭৫০ টাকা রিম, এখন তার দাম চার হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে, ২০২১ সালে যেখানে ২০বাই৩০ ইঞ্চি নিউজপ্রিন্ট ডিসি কাগজের রিম প্রতি দাম ছিল ৩৮০ টাকা, এখন তার দাম এক হাজার টাকা। একই কাগজের ডিডি এর দাম ২০২১ সালে যেখানে ছিল ৪৪৫ টাকা রিম, এখন তার দাম এক হাজার ১৮০ টাকা।’
মো. আরিফ হোসেন ছোটন আরও বলেন, ‘একদিকে ভালো মানের কাগজের দাম বেড়েছে, অন্যদকে গত দুই-আড়াই বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় রিসাইকেল করার জন্য বাতিল কাগজ পাওয়া যায়নি। সরকার আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের স্কুল শিক্ষার্থীদের হাতে ৩৫ কোটি বই তুলে দেবে। এছাড়া একুশে বইমেলায় বই প্রকাশনার জন্যও প্রচুর কাগজের ব্যবহার হবে। সহজ শর্তে বিনা শুল্কে অথবা স্বল্পশুল্কে কাগজ আমদানি করা না গেলে বই বিতরণ ও বইমেলায় চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা নেতারা বলেন, ‘শতভাগ ভার্জিন পাল্প দিয়ে কাগজ উৎপাদন করলে তার দাম হবে এক লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। নিউজপ্রিন্ট কাগজের দাম বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। এখানে একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে।’
বক্তারা বলেন, বিভিন্ন ধরণের কাগজের ওপরে ৪০ থেকে ৫৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা আছে। যখন যে দাম থাকে, তার চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা কম রাখেন মিল মালিকরা। যাতে আমরা কাগজ আমদানি না করি। পাল্প অল্প আমদানি হচ্ছে। বেশি আমদানি করলে তো বাজারে কাগজের দাম কমে যাবে। অনেকগুলো কাগজের মিল এক সাথে হয়ে সিন্ডিকেট করে তাদের ইচ্ছামতো অল্প করে পাল্প আমদানি করছে। ফলে কাগজ উৎপাদন কমেছে। কাগজের দাম বাড়ায় বইমেলার বইয়ের দামও বাড়বে। বইমেলায় প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার বই বের হয়। এবার সেই সংখ্যা আরও কমবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতে গত বছর কাগজের রিম ছিল তিন হাজার। এখন সেই কাগজের দাম চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের দেশে দাম বেড়েছে দুই থেকে তিন গুণ। অবশ্যই একটা সুযোগসন্ধানী গ্রপ এর পেছনে কাজ করছে। একটা মিল মালিক দাম বাড়ালে সাথে সাথে অন্যগুলোও দাম বাড়াচ্ছে। কেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেটি আমাদের জানা নেই। কাগজের দাম না কমালে সৃজনশীল বই প্রকাশ কমার পাশাপাশি পাঠকও কমে যাবে।’
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘আমরা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো কাগজ কিনব না এবং এই সময়ে এনসিটিবির পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই ছাপাব না।’
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ করা হয়। এগুলো হলো- উদ্ভুত সমস্যা সমাধানে সরকারি প্রতিনিধি, কাগজের মিল মালিক, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির প্রতিনিধি এবং কাগজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে কারণ চিহ্নিত করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; দ্রুত বিদেশ থেকে কাগজ আমদানিতে শুল্কমুক্ত ঘোষণা করা; দেশের সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কাগজকে রিসাইকেলিং কাজে ব্যবহার করার ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখা; গুদামজাত কাগজ থাকলে তা স্বাভাবিক মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা; শুল্ক হ্রাস/মুক্ত করা ছাড়াও অন্যবিধ কী ভর্তুকি বা প্রণোদনামূলক ছাড় সরকার কর্তৃক দেওয়া সম্ভব, তা ভেবে দেখা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন, আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গণি প্রমুখ।
