ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ

জমকালো আয়োজন, বিতর্ক আর আপসের বিশ্বকাপ

জমকালো আয়োজন, বিতর্ক আর আপসের বিশ্বকাপ
×

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

জোনাথন উইলসন

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২২:৩৩ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০০:৫৫

নিউ জার্সির নীল আকাশে তখনো সোনালি কাগজের কুচিগুলো উড়ছে। এত দ্রুত টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা নিশ্চয় কিছুটা তড়িঘড়ি। প্রকৃত হিসাব-নিকাশ তো পরে, যখন সব ধুলোবালি মুছে যাবে, স্মৃতিগুলো সংহত হবে মনের কোণে, আর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দূরগামী প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করবে। তবে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও পাবলো গাভির হাতাহাতি দিয়ে যে বিশ্বকাপের পর্দা নামল, ফুটবলের ইতিহাসে তার অবস্থান ঠিক কোথায়- এর প্রাথমিক মূল্যায়ন তো করাই যায়।

আপাতত মনে হতে পারে, বিশ্ব ফুটবল অনেক এগিয়ে গেছে, ‘বালোগান বিতর্ক’ পেছনে পড়েছে। আসলে কি তাই! বড় টুর্নামেন্টের চরিত্রই কি এমন?

নিশ্চয় এমন টুর্নামেন্টের নিজস্ব গতি থাকে, যা শিরোপার দিকে যাওয়ার পথে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে, রাজনৈতিক চাপের কাছে ফিফার নতি স্বীকার এবং নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে মাঠে নামাতে দীর্ঘ ৬৪ বছরের নিয়ম-কানুনের অপব্যবহারকে ‘মাইলফলক’ বলতেই হয়। ঠিক যেভাবে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তারকা খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিষেধাজ্ঞা (লাল কার্ডের জন্য) কমিয়ে বিশ্বকাপের শুরু থেকে খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন, কিংবা ইন্টার মায়ামির লিওনেল মেসিকে খেলাতে ক্লাব বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের নিয়ম রাতারাতি বদলে দিয়েছেন।

হয়ত ভবিষ্যতে আমরা এমন নিয়মনীতি সহজভাবেই নেব। কারণ ফুটবলে নীতি-নৈতিকতা বা খেলার সৌন্দর্য রক্ষার চেয়ে পকেট ভারী করা বা ব্যবসা বাড়ানো এখন আসল কথা! ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরের পুরোটা তারই উদাহরণ।
 
ব্রিটিশ ও আমেরিকান অনেক রাজনীতিবিদ এরই মধ্যে ফিফা প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। এই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে ইনফান্তিনোর পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে বিশ্বকাপকে ৬৪ দলে উন্নীত করা।

যাহোক, মাঠের খেলায় আড়ালে পড়ে যাওয়া আরও অনেক কেলেঙ্কারি নিশ্চয় শিগ্‌গিরই মাথাচাড়া দেবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইরানের কথা। তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা শুধু অন্যায় নয়, নজিরবিহীন। হয়ত ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে টিকিটের দামও কিছুটা কমবে, তবে যেসব মানুষ প্রতি সপ্তাহে মাঠে গিয়ে পছন্দের ক্লাবের খেলা দেখেন, তাদের জন্য টিকিটের একটা অংশ বরাদ্দ রাখা ধারণার এবার মৃত্যু ঘটেছে। ফলে বিশ্বকাপ আর সাধারণ মানুষের উৎসব নয়, এটি ধনকুবেরদের বিলাসবহুল ইভেন্ট।

আয়োজক শহরগুলো সামাজিক ও আর্থিকভাবে কী মূল্য দিয়েছে, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় গৃহহীন বহু মানুষকে শহরের রাজপথ থেকে ঝাড়ু দেওয়ার মতো তাড়ানো হয়েছে। নথিপত্র, পরিচয়পত্র এমনকি ওষুধপত্র কেড়ে নিয়ে তাদের নিঃস্ব করা হয়েছে। মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ প্রকল্পের জন্য নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে এরই মধ্যে জনরোষের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইতালির পত্রিকা ‘লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ট’ ফাইনালের ঠিক আগের দিন দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ রিপোর্টে এই বিশ্বকাপকে সরাসরি ‘মহাবিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছে। পত্রিকাটি টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, বালোগান কেলেঙ্কারি, তীব্র তাপদাহ, ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সুযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে। 

কিন্তু এরপর ফিফা যা করেছে তা সত্যি সত্যিই মহাবিপর্যয়! ফাইনাল ম্যাচে ওই পত্রিকার জন্য নির্ধারিত সাংবাদিকদের টিকিট পাঁচ থেকে কমিয়ে ফিফা দুটি করেছে। রিপোর্ট প্রকাশ ও টিকিট কমানোর ঘটনা দুটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কিনা- তা স্পষ্ট নয়। তবে, ফিফার অফিশিয়াল বয়ান- ‘এটি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ’- মানতে অস্বীকার করায় কোনো সংবাদমাধ্যমকে প্রবেশের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার ঘটনা একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

সংবাদমাধ্যমের প্রতি ফিফার এই অহংকারী মনোভাব টুর্নামেন্টজুড়েই ছিল; যদিও কিছু ভেন্যু, বিশেষ করে হিউস্টন এবং আটলান্টা আতিথেয়তার দিক থেকে উদাহরণ তৈরি করেছে। তবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এটি ছিল গত ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে বাজে। সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের ওয়াই-ফাই বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মাথা ঘামাবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এটি ফিফার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। 

মাঠের কথা বললে, বেশ কিছু দুর্দান্ত ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ আমরা দেখেছি; যেমন ব্রাজিল-জাপান, মরক্কো-নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড-মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে, নরওয়ে-আইভরি কোস্ট, বেলজিয়াম-সেনেগাল, নরওয়ে-ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা-মিসর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই রোমাঞ্চ সবই ছিল শেষ ৩২ বা শেষ ১৬তে। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচগুলো বিশেষ কিছু ছিল না। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়টি নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর। ইংলিশদের সেই বিপর্যয় নিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় নিশ্চয় বহু বছর আলোচনা হবে। কিন্তু অন্য সেমিতে ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের জয়টি ছিল সহজ। স্পেন শুরুতেই এমন আধিপত্য বিস্তার করে যে, ফরাসিরা চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগই পায়নি।

আর ফাইনাল? বিদঘুটে ও বিশ্রী এক ম্যাচ। কার্যকর কৌশলে যোগ্য দলটিই ট্রফি জিতেছে। ফাইনালের এই বিষাদময় দৃশ্যপট এবারের আসরকে ২০২২ কিংবা ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের পেছনে নিয়ে গেছে। তবে ইতিহাসে একটি ‘মাঝারি মানের টুর্নামেন্টের’ জায়গা কোথায় হয়, ২০০৬ নাকি ২০১৪-এর ওপরে বা নিচে, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের ফুটবল বিষয়ক কলামিস্ট

আরও পড়ুন

×