ট্রাস্কফোর্সের প্রতিবেদন
রাজনৈতিক কারণে বিবিএসের তথ্যউপাত্ত প্রকাশ ব্যাহত হয়েছে
বিবিএস আয়োজিত সেমিনারে প্রতিবেদন প্রকাশ। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:০৫
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের একটি তথ্যউপাত্ত প্রকাশ প্রক্রিয়ায় বাইরের হস্তক্ষেপ। তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত ও প্রকাশের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ ও সেগুলোর সহজপ্রাপ্যতা প্রায়ই ব্যাহত হয়েছে। এর কারণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা, দাতাদের ওপর নির্ভরতা এবং আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ। আর এটি শুধু মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করে না বরং নীতিনির্ধারণে পরিসংখ্যানের প্রাসঙ্গিকতাও কমিয়ে দেয়।
বিবিএসের সংস্কার বিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পনির্ভর কার্যক্রমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বিবিএস তার মূল দায়িত্ব নিয়মিত ও নিরপেক্ষ জাতীয় পরিসংখ্যান প্রণয়ন থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
আজ সোমবার বিশ্ব ও জাতীয় পরিসংখ্যান দিবসে বিবিএস আয়োজিত এক সেমিনারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। আট সদস্যের এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী এবং ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মিজানুর রহমান।
সেমিনারে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পরিসংখ্যান এখন সমাজের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। গত ৫৩ বছরে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যার কিছুটা সঙ্গত আর কিছুটা হয়তো সঙ্গত নয়।
তিনি বলেন, মানসম্মত পরিসংখ্যান তৈরির জন্য মানসম্মত প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন হয়। তাই শুধু মান চাইলেই হবে না, পর্যাপ্ত অর্থায়নও লাগবে। তাঁর মতে, বিবিএসের বর্তমান প্রকল্পের সংস্কৃতি সংস্থাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৬-০৭ এর দিকে তহবিল অনিশ্চয়তার কারণে বিবিএসের পরিসংখ্যানগত কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দাতা তহবিলের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটিতে একটি প্রকল্প সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেটি অস্বাস্থ্যকর পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া পদ্ধতি আরোপে অবদান রেখেছে।
বিবিএসকে একটি আধুনিক, পেশাদার ও স্বাধীন জাতীয় পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ী কাঠামো এবং নীতি-সংস্কার ভিত্তিক রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়, বিবিএস রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রায়ই নির্ধারণ করে দেয় কোন তথ্য প্রকাশ পাবে, আর কোনটি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সময়ানুবর্তিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (এনএসও) আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার মেরুদণ্ড। এ বিষয়ে মানুষের আস্থা তখনই পুনরুদ্ধার হবে যখন তথ্যউপাত্ত পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রকাশিত হবে। বিবিএসের বাজেট স্বায়ত্তশাসন এবং আর্থিক স্বাধীনতা প্রয়োজন। মুক্ত তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত ও প্রকাশের নীতিমালার কথাও বলেছে টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্স পরিকল্পনা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করে সংস্কার বাস্তবায়ন তদারকির সুপারিশ করেছে।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি পরিসংখ্যান রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয় কিনা সেই প্রশ্ন ওঠে। আসলে পরিসংখ্যানে কারচুপি হয় না, এর পরোক্ষ অপব্যবহার আছে। পরিসংখ্যান অনুকূলে থাকলে প্রকাশ করা হয়। আবার অনুকূলে না থাকলে প্রকাশ করা হয় না। এভাবে অর্ধসত্য প্রকাশিত হয়। আবার বিভিন্ন পদ্ধতিগতভাবে পরিসংখ্যান তৈরি করতে গিয়ে যেটা ভালো দেখায়, সেটা প্রকাশ করা হয়। এভাবে পরোক্ষ অপব্যবহার হয়।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে বিবিএসকে স্বাধীনতা দেওয়া দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টাক্সফোর্সের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে। এতে অনুমতি ছাড়াই পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে পারবে বিবিএস। আগে যেসব পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যেত হতো, এখন সেগুলোর আর কাউকে দেখানোর প্রয়োজন হবে না।
- বিষয় :
- বিবিএস
