ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বন্ধ হতে যাওয়া ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ব্যক্তি আমানতকারীর আসল টাকা পুরোটা ফেরত দেওয়া হবে

ব্যক্তি আমানতকারীর আসল টাকা পুরোটা ফেরত দেওয়া হবে
×

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক-বহির্ভূত ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে শুনানি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধের আগে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের জমা আসল টাকার পুরোটা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য কোষাগার থেকে দেওয়া হবে ২ হাজার ৬শ কোটি টাকা। পরে ঋণ পুনরুদ্ধার বা সম্পদ বিক্রিসাপেক্ষে আনুপাতিক হারে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ফেরত দেওয়া হবে। মালিকপক্ষের জালিয়াতির কারণে ২০১৮ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠান খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ থেকে অবসায়নে সম্মতি দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই। আগামী সপ্তাহে বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানের শুনানি হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার আগে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ হলো শুনানি। 
এর আগে গত বছরের মে মাসে খারাপ অবস্থায় থাকা ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না জানতে চেয়ে নোটিশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নোটিশের পর ১১টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য সময় নিয়েছে। ৯টি প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হলে তা অনুমোদন হয়।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি ও প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেসস্টমেন্ট লিমিটেড। 
দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি এই তিন সূচকের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের মাধ্যমে ব্যক্তি আমানতকারীর মূল টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।
সাধারণভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি থেকে অর্থ ফেরত দিতে হয়। এজন্য অবসায়ক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির পুরো দায়দেনা বের করা হয়। এরপর সম্পদ বিক্রি করে আনুপাতিক হারে আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তি আমানতকারী অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। বিদ্যমান নিয়ম অনুসারে, কোনো ব্যাংক অবসায়ন বা বন্ধ করা হলে একজন আমানতকারীর যতো টাকা জমা থাকুক বীমা তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পান। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনরুদ্ধার বা সম্পত্তি বিক্রি করে আনুপাতিক হারে টাকা ফেরত দিতে হয়। দেশের সব ব্যাংক অনেক আগ থেকে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় থাকলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্প্রতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বন্ধ হতে যাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত এই আইনে হচ্ছে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বন্ধ হতে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা, সাবেক বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ টাকা রেখে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এরকম অবস্থায় সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীদের আসল অঙ্কের পুরোটা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এটি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের বড় অংশ মালিকপক্ষ আত্মসাৎ করেছে। যে কারণে অর্থ ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদও তেমন নেই। বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্সের মোট ঋণের এক হাজার ৮১৪ কোটি টাকা বা ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ খেলাপি। ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান এক হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি। আর লোকসান এক হাজার ১৭ কোটি টাকা। বিআইএফসির ৯৭ দশমিক ৩০ শতাংশ ঋণখেলাপি এবং লোকসান এক হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের তিন হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ শতাংশ খেলপি। ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান ৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। পিপলস লিজিংয়ের ৯৫ শতাংশ খেলাপি। আর লোকসান ৪ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। আভিভা ফাইন্যান্সের ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বা ৮৩ শতাংশ খেলাপি। ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার লিজিংয়ের ৯৮৪ কোটি টাকা বা ৭৫ শতাংশ খেলাপি। লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা। জিএসপি ফাইন্যান্সের ৫১৫ কোটি টাকা বা ৫৯ শতাংশ খেলাপি। লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা। এছাড়া প্রাইম ফাইন্যান্সের ৫৩৪ কোটি টাকা বা ৭৮ শতাংশ ঋণখেলাপি। ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে। সমস্যাগ্রস্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের এক হাজার ১৮৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৯৬ শতাংশ খেলাপি। ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৭৫৮ কোটি টাকা ঋণের ৯৫ শতাংশ খেলাপি। ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেসস্টমেন্টের ২ হাজার ৫৩৫ টাকা ঋণের ৮৩ শতাংশ খেলাপি। উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা ঋণের ৮২ শতাংশ খেলাপি। 
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্সের ৮৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৭১ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ন্যাশনাল ফাইন্যান্সের ৫৩৫ কোটি টাকা ঋণের ৬৪ শতাংশ খেলাপি। হজ ফাইন্যান্স কোম্পানির ৬২৮ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৬২ শতাংশ খেলাপি। মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ৩১৮ কোটি টাকা ঋণের ৫৭ শতাংশ, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ৯৫২ কোটি টাকা ঋণের ৫৬ শতাংশ, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ৮২৮ কোটি টাকা ৫৫ শতাংশ এবং সিভিসি ফাইন্যান্সের ৩৫৪ কোটি টাকা ঋণের ৫৩ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে আমানতকারীর স্বার্থ পরিপন্থি ব্যবসা পরিচালনা, আমানতকারীর দায় পরিশোধে সম্পদের অপর্যাপ্ততা এবং মূলধন সংরক্ষণ করতে না পারায়। তবে যাদের অপরাধে প্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যায়ে এসেছে তাদের থেকে অর্থ উদ্ধার কিংবা উদ্ধারের জন্য দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিয়ে জমা টাকা ফেরত দিলে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

×