৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের আয় ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে প্রায় ৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের আয় ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। আর ৭ শতাংশ শ্রমিকের আয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে। চাকরির নিরাপত্তাহীনতার কারণে শ্রমিকদের এই নাজুক অবস্থা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যেও সাব-কন্ট্রাক্টিং বা ঠিকা কাজ ও বাসাবাড়িভিত্তিক কাজের মাধ্যমে পোশাক খাতের কর্মসংস্থানের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের চাকরির কোনো লিখিত চুক্তি নেই।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইউএনএসকাপের ৫৩টি সদস্য ও ৯টি সহযোগী সদস্য দেশের ওপর পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদনটি গত সোমবার প্রকাশ করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংস্থার বিভিন্ন দেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং এর অভিঘাতের কথা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ ও বিভাজনের বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সুদূরপ্রসারী আর্থসামাজিক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছে ইউএনএসকাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি চাহিদা কমে গেলে অনানুষ্ঠানিক এবং সাব-কন্ট্রাক্টে ঠিকা কাজে থাকা শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। কারণ, এ ধরনের কাজে কোনো নোটিশ পিরিয়ড বা চাকরির নিরাপত্তা থাকে না। এ কারণে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণত যে কোনো পরিস্থিতিতে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের শ্রমিকরাই প্রথম শিকার হয়ে থাকেন। এ ছাড়া পুনরায় নিয়োগের ক্ষেত্রে এদের অগ্রাধিকার থাকে না। দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্রমাগত রপ্তানি চাহিদা কমে যাওয়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রাক্কলন তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দুই কোটি ৭০ লাখের বেশি চাকরি বা মোট উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানের ৯ শতাংশ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত চাহিদার সঙ্গে যুক্ত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের পোশাক ও পাদুকা শিল্পের কথা উল্লেখ করা হয়। এই তিন দেশের বাইরে অন্যান্য দেশের বস্ত্র খাত, অটোমোবাইল শিল্প, বৈদ্যুতিক ও অপটিক্যাল সরঞ্জামের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। এসব শিল্প খাতের অনেকটিই শ্রমনিবিড় শিল্প, যেখানে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক-পরবর্তী খুচরা মূল্যবৃদ্ধি যাতে এড়ানো যায়, সেই কৌশল হিসেবে রপ্তানিকারকরা তাদের মুনাফার মার্জিন না কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি ও সুবিধা কমাবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে বের করা ও অন্যান্য দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের হারের বিষয় দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রভাবে কর্মসংস্থান প্রভাব ফেলবে, যা সরাসরি দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়াবে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি প্রশংসাও করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে পোশাক খাত বিশ্বের একক বৃহত্তম পোশাক কর্মী বাহিনী। ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করে এই শিল্পে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির ২০ শতাংশের মতো যায় একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র।
শিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ পোশাক খাতের মোট শ্রমিকের প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় সাতজনই নারী। অন্যান্য দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কায়ও সম-অনুপাতে নারী শ্রমিক রয়েছে। কম্বোডিয়ায় এই হার আরও বেশি। সেখানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই নারী। পাকিস্তানে এই হার তুলনামূলক কম। প্রতি ১০ জনে পাঁচজনের মতো। এই খাতে মজুরি সাধারণত সর্বনিম্ন স্তরে বা তার সামান্য ওপরে থাকে। ভিয়েতনামের পোশাক খাতে নারীদের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম।
ইউএনএসকাপের প্রতিবেদনে বলা হয়, কম্বোডিয়ার পোশাক, টেক্সটাইল ও পাদুকা খাতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। পাকিস্তানে পোশাক খাতে যত শ্রমিক কাজ করছেন, তা দেশটির উৎপাদনমুখী শিল্পের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশ। এদের মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮০ থেকে ৮৭ শতাংশই অনিবন্ধিত বা অনানুষ্ঠানিক। শ্রীলঙ্কায় পোশাক উৎপাদন খাতে আনুষ্ঠানিক খাতে প্রায় তিন লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে। এর বাইরে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সমপরিমাণ, অর্থাৎ তিন লাখ শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে, যারা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
- বিষয় :
- পোশাক শ্রমিক
