ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খেলাপি ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ

খেলাপি ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ
×

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৩ সালে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর সময় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে ১০ শতাংশের নিচে নামানোর শর্ত ছিল। তবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় ২০২৫ সাল শেষে ৩০ শতাংশ ছাড়ায়। আইএমএফ বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। এখন ১০ শতাংশের বিষয়ে কঠোর না থাকলেও খেলাপি ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে সংস্থাটি। 

আইএমএফ ঋণের অন্যতম শর্ত কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। এ ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার আগামী বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোন কোন পদক্ষেপ নেবে তাও জানতে চেয়েছে আইএমএফ। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকের সময় ওই দুটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। 

আইএমএফের ঋণের বিষয়ে আলোচনায় সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, খেলাপি ঋণ কমানো ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ লিখিতভাবে জানানো হবে। অবশ্য আইএমএফকে আগেই খেলাপি ঋণ কেন বেড়েছে তা জানানো হয়। বিভিন্ন নীতিসহায়তার আড়ালে রাখা খেলাপি সামনে আনার বিষয়টি আইএমএফ ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। 

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি ৮০ কোটি ডলার বেড়ে আকার হয়েছে ৫৫০ কোটি ডলার। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তিন কিস্তিতে বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে আগামী জুনের মধ্যে দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা থাকলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় চলমান ঋণ কর্মসূচি ও নতুন ঋণের বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব বৈঠকে অংশ নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর এখন আবার কমবে বলে আশা করছেন তারা। কীভাবে কমানো হবে, সে বিষয়ে আইএমএফকে সুনির্দিষ্ট করে জানানো হবে। ঋণখেলাপিদের দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ, আদায়ে আইনের প্রয়োগ, সমঝোতার ভিত্তিতে ঋণ আদায়ে উৎসাহ দেওয়া, বন্ধ কারখানা সচল করার উদ্যোগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে ওঠে। সেখান থেকে গত ডিসেম্বরে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ২৫ শতাংশের নিচে নামতে পারে। অবশ্য একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক বাদ দিলে খেলাপি ঋণ এরই মধ্যে ২৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার কর্মসূচির বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। নতুন বিভিন্ন উদ্যোগ তাদের জানানো হবে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন ধারা যুক্ত করার বিষয়টি তাদের অবহিত করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি আইএমএফ থেকে আরও ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক সংকট মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফের ৫ হাজার কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তার প্যাকেজ থেকে এ অর্থ চাওয়া হয়েছে। 

তারা জানান, কোনো কারণে আইএমএফের চলমান কর্মসূচি যাতে বাতিল না হয়, তা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কেননা আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করলে অন্য সংস্থাগুলোর কাছে খারাপ বার্তা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেশের ঋণমান কমিয়ে দেওয়া হয়। আবার বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট লাইনসহ অনেক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যে কারণে ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে কিস্তি ছাড় নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। 

জানা গেছে, কর-জিডিপি বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর পদক্ষেপ, ঠিক মতো কর দিচ্ছে কিনা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাইয়ের উদ্যোগসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সরকারের বিভিন্ন কার্ড ইস্যুর যৌক্তিকতা সংস্থাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। এ কর্মসূচি শুরুর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশকে বিভিন্ন শর্ত দেয় সংস্থাটি। এসব শর্তের অন্যতম একটি ছিল– ধাপে-ধাপে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকের ১০ শতাংশের নিচে নামাতে বলা হয়। 
খেলাপি ঋণের হিসাব পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের করা, সব ধরনের শিথিলতা তুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন শর্ত দেয় সংস্থাটি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি
ঋণ দেখানো হয়েছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ওই সময় বেসরকারি খাতে ৫ দশমিক ১৩ এবং রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ছিল ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ।

আরও পড়ুন

×