ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজস্ব আদায় ২৩ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা

রাজস্ব আদায় ২৩ শতাংশ  বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা
×

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হচ্ছে। খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে তা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। 

অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে। আগামীকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তা উপস্থাপন করা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। এর পরদিন আগামী বাজেটে শুল্ক-করসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। পরে তা সংশোধন করে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে সময় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল। সে হিসাবে, আগামী বাজেট চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হচ্ছে। অতীতে সাধারণত প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাজেট বাড়ানো হলেও গত অর্থবছর ছিল ব্যতিক্রম।

সরকারের এ বাড়তি ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। অথচ সাধারণত অর্জিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়নসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। তবে প্রবৃদ্ধির ধারা বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত আদায় কোনোভাবেই ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে আগামী বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে চলতি অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা।
সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আদায়কারী সংস্থা এনবিআরের জন্য নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা যেকোনো সময়ের তুলনায় রেকর্ড। এর আগে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে এনবিআরকে। এ জন্য প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা সংশ্লিষ্টদের মতে প্রায় অসম্ভব।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকারের ব্যয় মেটাতে এবং ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব বাড়ানো অপরিহার্য। তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত এবং তা অর্জনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এনবিআর প্রতিবছর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করে না। বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

রাজস্ব বাড়াতে সরকার অটোমেশন, করের আওতা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং করবহির্ভূত আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি বাজেটে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। নতুন বাজেটে এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার বেড়ে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। 

আরও পড়ুন

×