বাংলাদেশে পরোক্ষ করনির্ভরতা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবেশী দেশ ভারতে সরকারের মোট কর আয়ের মধ্যে পরোক্ষ করের অংশ অর্ধেকেরও কম। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট করের ৭৮ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। পরোক্ষ করনির্ভরতার এই হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। বাজেটে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের মতো পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘পরোক্ষ করের ওপর অতি নির্ভরশীলতা: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে ভয়েস ফর রিফর্ম।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে সরকারের বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ভারতে পরোক্ষ কর সরকারের মোট করের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোতে এর গড় হার প্রায় ৫০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে তা ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। এর প্রধান কারণ প্রত্যক্ষ কর বিশেষ করে আয়কর আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুর্বলতা। সহজ উপায়ে রাজস্ব আহরণের পথ হিসেবে সরকার পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, তাত্ত্বিকভাবে অগ্রিম আয়কর প্রত্যক্ষ কর হলেও বাস্তবে এটিও অনেকাংশে পরোক্ষ করের মতোই কাজ করছে। পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার অগ্রিম কর আরোপের ফলে তা কার্যত দ্বৈত করে রূপ নিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামের ওপর। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির পেছনে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনায় এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রের নিজস্ব উদ্যোগে কখনও রাজস্ব খাতের বড় সংস্কার হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দাতা সংস্থার চাপে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত কার্যকরী হয়নি। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার টেকসই সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই ভ্যাট হার ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর কাঠামো সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্সও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ভ্যাট হারের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সেই টাস্কফোর্সের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে কার্যকর আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনা জরুরি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেলের জন্য অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার সময় এখন নয়।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অনেক বেশি। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতি জাহাজীকরণে গড়ে ব্যয় হয় ভিয়েতনামে ৫৫৬ ডলার, ভারতে ৩৬৬ ডলার। অথচ বাংলাদেশে ব্যয় দাঁড়ায় এক হাজার ২৭০ ডলার। একইভাবে বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগে ৩৬০ ঘণ্টা, যেখানে ভিয়েতনামে লাগে ১৩২ ঘণ্টা, ভারতে ৮৫ ঘণ্টা। এসব কারণে উৎপাদন ও ব্যবসা ব্যয় বাড়ছে। ফলে তৈরি পোশাক খাতে মধ্যম মূল্যের বাজারে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা ছিল, তার বড় অংশ ভিয়েতনাম দখল করেছে। অন্যদিকে ভারতও নিম্নমূল্যের বাজার ধরতে জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, ইউনিলিভার বাংলাদেশের সাবেক হেড অব ট্যাক্স সাঈদ আহমেদ খান, ভ্যাট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. আব্দুর রউফ এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার মালা।
- বিষয় :
- আয়কর
