করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা হবে চার লাখ টাকা। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে হবে সাড়ে চার লাখ টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রস্তাব দেয়। তবে ওই সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা বহাল রাখা হয়। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটিই বহাল থাকছে।
আগামী অর্থবছরে কর হারেও পরিবর্তন আসবে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও যারা সীমার কিছুটা ওপরে থাকবেন, তাদের করের বোঝা কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ, আগামী অর্থবছরে ৫ শতাংশের কর হার তুলে দেওয়া হতে পারে। এর পরিবর্তে যাদের বার্ষিক আয় পৌনে চার লাখ টাকার বেশি, তাদের করমুক্ত আয়সীমা পরবর্তী প্রথম তিন লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, চার লাখ টাকার ওপর ১৫
শতাংশ, পাঁচ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, ২০ লাখ টাকার জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের জন্য ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হতে পারে।
চলতি অর্থবছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি প্রথম এক লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হচ্ছে। বার্ষিক আয় সাড়ে চার লাখ টাকা হলে তাকে বর্তমান নিয়মে পাঁচ হাজার টাকা কর দিতে হয়। আগামী বাজেটে যদি সর্বনিম্ন কর হার ৫ শতাংশ তুলে দেওয়া হয় এবং করদাতার বার্ষিক আয় সাড়ে চার লাখ টাকা হলে ৭৫ হাজার টাকার ওপর কর বসবে। আর সেই আয়ের ওপর যদি ১০ শতাংশ হারে কর বসে তাহলে তাকে দিতে হবে সাড়ে সাত হাজার টাকা।
বর্তমানে দেশে এক কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাদের মধ্যে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করেন প্রায় ৪৬ লাখ করদাতা। করদাতাকে রিটার্ন দেওয়ার সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করতে হয়।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করবে সরকার। পে স্কেল ঘোষণার পর মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। সে জন্য কম আয়ের করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাইযোদ্ধা’ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য এটি বহাল রাখার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে যে কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ‘কৃষি থেকে আয়’ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখা হয়েছিল। এটি বহাল রাখা হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের মতো আগামী করবর্ষেও চাকরিজীবী কর্মচারীদের কিডনি, লিভার, ক্যান্সার, হার্টের চিকিৎসার পাশাপাশি মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ও কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন-সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রাপ্ত অর্থকে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হতে পারে। একইভাবে আগামী অর্থবছরেও জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আয়, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে প্রাপ্ত সুবিধাভোগীর যে কোনো আয় এবং জিরো কুপন ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট থেকে উদ্ভূত আয়কে করমুক্ত রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ সমকালকে বলেন, ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি বেশি হারে বাড়ছে। এখনও মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক। অতএব করমুক্ত আয়সীমা এখনই বাড়ানো উচিত। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে খুব বেশি লাভ হবে না। কারণ মূল্যস্ফীতি কমে এলে তখন করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দরকার হবে না।
একবারে ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত করের ধাপগুলো নির্দিষ্ট করে দিলে বড় সমস্যা হবে বলে মনে করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। সমকালকে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে থেকেই করের হার জানিয়ে দেওয়া হলে সেটি করদাতার ব্যবসা বা ব্যক্তিগত পরিকল্পনার জন্য ভালো হয়। বিশ্বজুড়ে এই প্রথা চলছে। তবে তা সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী করের হারগুলো প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম বাড়ার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করতে হবে।
