ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

এনবিআরের অগ্রাধিকার

রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ

করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে আস্থা  ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
×

আহসান হাবিব

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি অর্থবছরের রেকর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বড় দায়িত্ব এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। সম্প্রতি সংস্থাটি নতুন চেয়ারম্যান পেয়েছে। ৫৩ বছর পর সংস্থার নিজস্ব ক্যাডার থেকে চেয়ারম্যান পাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। 

রাজস্ব বোর্ড সূত্র জানায়, সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এনবিআরের বিভিন্ন সেবাকে অটোমেশন করার পরিকল্পনা করে গেছেন। নতুন চেয়ারম্যানও তাঁর অগ্রাধিকার তালিকায় কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরে জোর দিয়েছেন। 

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তির মধ্য দিয়ে গেছে এনবিআর। সেই ক্ষত উপশমও করতে হবে তাঁকে। 

এ অবস্থায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্র ঠিক করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ভেদাভেদ ভুলে নিজেদের মধ্য সমন্বয় বাড়ানোর তাগেদ দিচ্ছেন।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন 
উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তাই এনবিআরের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আহরণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল। রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং করদাতাবান্ধব ব্যবস্থাপনা দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে চায় নতুন প্রশাসন।  

এ লক্ষ্যে প্রতিটি কর অঞ্চল ও কাস্টমস কমিশনারেটের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই), মাসভিত্তিক রাজস্ব পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করার কথা বলা হচ্ছে।

শতভাগ অনলাইনভিত্তিক সেবা 
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান করদাতাদের জন্য এমন একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। তাতে কর নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ, রিফান্ড, আপিল, ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত সেবা 

সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে গ্রহণ করা যাবে।
স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ই-অডিট এবং সমন্বিত ডেটা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে করদাতাদের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, হয়রানি হ্রাস পাবে, সেবার স্বচ্ছতা বাড়বে।
 
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি 

নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এমন একটি রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলতে চান, যেখানে কর আইন হবে সহজ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ও কর-সংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ডিজিটাল করার ওপর জোর দেওয়া হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও রাজস্ব প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান কর আদায় ও ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চান।
 
করের আওতা সম্প্রসারণ 
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন। দেশের বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। ফলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এখন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে নতুন করদাতা শনাক্ত করায় জোর দেবে এনবিআর। ব্যাংকিং তথ্য, ভূমি নিবন্ধন, যানবাহন, শেয়ারবাজার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স এবং অন্যান্য সরকারি ডেটাবেজের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে এটা করা হবে। 

উচ্চ আয়ের পেশাজীবী, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী এবং করের আওতার বাইরে থাকা সম্ভাব্য করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। 


যথাযথ ও ন্যায্য কর আদায় 
কর আদায়ের মূল দর্শন হবে ‘যার যত সক্ষমতা, তার তত কর’। কোনো করদাতাকে হয়রানি নয়, আবার কেউ যেন কর ফাঁকি দিয়ে পার না পায়– এই নীতি সামনে রেখে কর প্রশাসন পরিচালিত হবে।
ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যাচাই, স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কর প্রশাসনের মাধ্যমে কর নির্ধারণ করা হবে। এতে সৎ করদাতারা হয়রানিমুক্ত সেবা পাবেন এবং অসাধু করদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।
করদাতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, দ্রুত আপিল ব্যবস্থা, কর শিক্ষার প্রসার এবং করদাতাবান্ধব সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি আস্থাভিত্তিক কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথাও বলছে এনবিআর।
 
কর ফাঁকি প্রতিরোধ ও দমন 
কর ফাঁকি প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চান নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান। প্রতিবছর কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস, ইলেকট্রনিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা হবে। 
বিশেষ করে ভুয়া ইনভয়েস, আন্ডার-ইনভয়েসিং, ওভার-ইনভয়েসিং, বেনামি সম্পদ, ডিজিটাল ব্যবসা এবং উচ্চমূল্যের আর্থিক লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
 
শুরুতে সমন্বয়ের উদ্যোগ  
রাজস্ব বোর্ড সূত্র জানায়, নিয়োগের পর ৫ জুলাই এনবিআর চেয়ারম্যান কর্মকর্তাদের সঙ্গে জুম মিটিং করেন। গত শুক্রবারও জুম মিটিং হয়। এসব সভায় সারাদেশ থেকে সংস্থাটির কর্মরত সহকারী কমিশনার থেকে সদস্য পদমর্যাদার প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা অংশ নেন। আন্দোলনের সময় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যের পর সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে দেশের স্বার্থে আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সম্মিলিতভাবে রাজস্ব আহরণে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান আহসান হাবিব। 

আহসান হাবিব বলেন, ভবিষ্যতে মেধা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হবে। আয়কর ও শুল্ক ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য থাকলে তা ভুলে যেতে হবে। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করদাতাকে হয়রানি করা কিংবা দুর্নীতির উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ সমকালকে বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে কোনো কর্মকর্তার খুশি বা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ এটা রাষ্ট্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ পদ। তিনি বলেন, শুরু থেকে আইআরডির সচিবই এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন; এবারই প্রথম এনবিআর থেকে নিয়োগ হয়েছে। তাই নতুন চেয়ারম্যানকে তাঁর স্বজনদের নেতৃত্ব দিতে হবে। স্বজনরা কতটা নির্দেশ মানবে, সেটি দেখার বিষয়। 

শুধু রাজস্ব আদায়ই চ্যালেঞ্জ তা নয়, অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের দায়িত্বও নতুন চেয়ারম্যানের কাঁধে। এনবিআরের সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত বছরের মে-জুনে কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। সেই সময়ের কমিশনার (সিআইসির মহাপরিচালক) আহসান হাবিব পদোন্নতি পেয়ে সদস্য ও এরপর চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। এনবিআরের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আহসান হাবিব এ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন না। ফলে তিনি চেয়ারম্যান হওয়ায় আন্দোলনে যুক্ত থাকা অনেক কর্মকর্তা দুশ্চিন্তায় পড়েন। তবে চেয়ারম্যান দুই দফায় বৈঠক করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার তাগিদ দেওয়াকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। 

এনবিআর চেয়ারম্যান সমকালকে বলেন, ‘আমার মেসেজ একেবারে স্পষ্ট। সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকার ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নই হবে আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথেই আমরা এগিয়ে যাব।’

 

আরও পড়ুন

×