ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশেষ লেখা

জমির মৌজা রেটের ফাঁদ ও উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়: সমাধানের পথ কী

জমির মৌজা রেটের ফাঁদ ও উচ্চ  নিবন্ধন ব্যয়: সমাধানের পথ কী
×
×

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

নিজের একখণ্ড জমি কিংবা একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করা এ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের অন্যতম স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে একজন মধ্যবিত্ত ক্রেতাকে পড়তে হয় চরম বাস্তবতার মুখে। অবাস্তব ‘মৌজা রেট’ এবং অস্বাভাবিক নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে জমি-ফ্ল্যাট কেনা যেমন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বড় অঙ্কের অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচায় মোট লেনদেন খরচ বাস্তবসম্মত ধার্য করা এবং মৌজা রেটকে ডিজিটাল ও যুগোপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই।

একটি জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে বর্তমানে সাধারণ ক্রেতাকে নানা শিরোনামে ফি ও কর দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে– ১.৫ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি, ১ শতাংশ নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ফি, প্রায় ২ শতাংশ পৌর বা স্থানীয় সরকার কর এবং উৎসে আয়কর, যা এলাকাভেদে ১ থেকে ৮ শতাংশ অথবা প্রতি শতাংশ/বর্গমিটারভিত্তিক নির্ধারিত করের মধ্যে, যা বেশি। 

বিক্রেতার মূলধনি মুনাফা করসহ সব মিলিয়ে দেখা যায়, দলিলের মূল্যের ১২ থেকে ১৮ শতাংশের বেশি অর্থ চলে যায় কেবল সরকারি প্রক্রিয়ায়। এর সঙ্গে  ডেভেলপারদের কর যোগ করলে ২৫ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। এই মাত্রাতিরিক্ত খরচের কারণেই তৈরি হয় প্রকৃত মূল্য গোপনের প্রবণতা। আর সেখানে সুযোগ তৈরি করে দেয় সরকার নির্ধারিত ‘মৌজা রেট’। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মৌজা দর প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। আবার কিছু এলাকায় তা অদ্ভুতভাবে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি। যেখানে মৌজা রেট কম, সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই অতিরিক্ত কর এড়াতে মৌজা রেটেই দলিল সম্পন্ন করেন। ফলে অর্থনীতিতে তৈরি হয় বড় ধরনের অস্বচ্ছতা।

ধরা যাক, এক ব্যক্তি ৩ কোটি টাকায় একটি সম্পত্তি বিক্রি করে মৌজা মূল্যের সুযোগ নিয়ে দলিলে দেখালেন মাত্র ১ কোটি টাকা। পরে তিনি আরেকটি ৫ কোটি টাকার সম্পত্তি কিনে দলিলে দেখালেন ৩ কোটি টাকা। এতে মাঝের ২ কোটি টাকার কোনো হিসাব রাষ্ট্রের নথিতে থাকে না। এই অর্থ কর জালের বাইরে থেকে যায় এবং অর্থনীতি থেকে হারিয়ে যায়। এর ফলে সরকার শুধু ন্যায্য কর থেকেই নয়; বিপুল অঙ্কের সারচার্জ থেকেও বঞ্চিত হয়। এভাবে আবাসন খাত অপ্রদর্শিত সম্পদ পুঞ্জীভূত করার সহজ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

সমাধানের উপায় 
বর্তমান মৌজা রেট পদ্ধতির বড় দুর্বলতা হলো, বাজার যাচাই ছাড়াই বছরের পর বছর এটি অবাস্তব জায়গায় স্থবির থাকে। এর সমাধান পুরোনো নিয়মে এক কলমের খোঁচায় রেট বাড়ানো নয়; বরং এর বৈজ্ঞানিক আধুনিকায়ন প্রয়োজন। 
মৌজাভিত্তিক পাইকারি দরের বদলে প্রতিটি এলাকার জমি ও ভবনের অবস্থান, অবকাঠামো ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী একটি ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। শুধু বিক্রয়মূল্য নয়, সংশ্লিষ্ট এলাকার বার্ষিক ভাড়ামূল্য ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে প্রপার্টির মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। সিটি করপোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিটি হোল্ডিংয়ের বিশদ তথ্য থাকে। ৩ থেকে ৫ বছর অন্তর নমুনাভিত্তিক জরিপ চালিয়ে মৌজা ডেটাবেজ হালনাগাদ করা প্রয়োজন, যাতে বাজারের কাছাকাছি থাকে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, মৌজা রেট বাড়িয়ে যদি প্রকৃত বাজারমূল্যের কাছাকাছি নেওয়া হয়, তবে কি নিবন্ধন ব্যয় আকাশচুম্বী হবে না? ঠিক এখানেই রাষ্ট্রের নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। মৌজা রেটকে বাজারমূল্যের সমান করার পূর্বশর্ত হলো, মোট নিবন্ধন খরচকে বর্তমানের ১০ থেকে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশে (যেমন: ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে) নামিয়ে আনা।
অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, উচ্চ করহার কর ফাঁকি বাড়ায়; আর সহনীয় করহার করদাতাকে উৎসাহিত করে। নিবন্ধন খরচ যখন স্বল্প ও সহনীয় হবে, তখন সামান্য অর্থ বাঁচাতে গিয়ে কেউ নিজের কোটি টাকার সম্পদ বেনামি বা অপ্রদর্শিত রাখার ঝুঁকি নেবে না। এতে লেনদেনের গতি বাড়বে এবং সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ও হবে বহুগুণ।

জমি ও আবাসন খাতের দীর্ঘদিনের এই অসংগতি দূর করার এখনই উপযুক্ত সময়। একদিকে নিবন্ধন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে সাধারণ মানুষের আবাসন কেনার স্বপ্নকে সহজ করা, অন্যদিকে মৌজা রেটকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ডিজিটালাইজ করে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা– এ দুই পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মাধ্যমে আবাসন খাতে লুকিয়ে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরবে; সরকারের করের পরিধি বাড়বে এবং দেশে একটি স্বচ্ছ কর কাঠামো গড়ে উঠবে। সাধারণ নাগরিককে স্বস্তি দেওয়া, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের কোষাগারকে সমৃদ্ধ করার এমন দ্বিমুখী সুযোগ হাতছাড়া করা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। 
লেখক: কর বিশেষজ্ঞ, পরিচালক
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

আরও পড়ুন

×