বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি নির্মাণে যে সতর্কতা জরুরি
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:১৬
ঢাকার কাগজে একটা খবর দেখে খুবই খুশি হলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছেন অসংখ্য চলচ্চিত্র
নির্মাতা এবং অসংখ্য পুরস্কার ও পদকপ্রাপ্ত তানভীর মোকাম্মেল। মুজিববর্ষে
বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি নির্মাণেরও পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
ভারতের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগে ছবিটি নির্মিত হবে। পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন
বিখ্যাত ভারতীয় পরিচালক শ্যাম বেনেগাল। দুটি খবর শুনেই আনন্দিত হয়েছি।
মুজিববর্ষে মুজিবের স্মৃতি রক্ষার ব্যাপারে এই দুটিই সবচেয়ে বড় উদ্যোগ।
চলচ্চিত্র এখন জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম। পশ্চিমা
সাম্রাজ্যবাদের প্রদীপ এখন সর্বত্রই নিভু নিভু। অস্ত্র ও চলচ্চিত্রের জোরে
এখনও টিকে আছে। চলচ্চিত্রের শক্তিটাই বেশি এবং স্থায়ী। পশ্চিমা চলচ্চিত্রে
তাদের পছন্দের লোককে দেবতা বানানো হয়, অপছন্দের লোককে দানব বানানো হয়।
পশ্চিমা চলচ্চিত্রে হিটলারকে দানব ও মানব জাতির শত্রু হিসেবে দেখানো হয়।
হিটলার ফ্যাসিস্ট ছিলেন। তিনি হত্যা করেছিলেন ছয় লাখ ইহুদি। আর পশ্চিমা
চলচ্চিত্রে ও প্রচারণায় চার্চিলকে মানবতার ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখানো হয়।
তিনি ব্রিটিশ ভারতে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে ৫০ লাখ নিরীহ নর-নারী
হত্যা করেছিলেন। চলচ্চিত্রের প্রচারণার জোরে এশিয়া-আফ্রিকার মানুষও
হিটলারকে ঘৃণা করে, চার্চিলকে নয়।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মহাত্মা গান্ধীকে নির্যাতন করেছে, জেলে দিয়েছে।
পরে সেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরাই তাকে দেবতা বানিয়ে 'গান্ধী' ছবি নির্মাণ
করে লাখ লাখ ডলার বাণিজ্য করেছে। গান্ধী ছবির বিশ্বব্যাপী দর্শকপ্রিয়তা
দেখে পাকিস্তান সরকার নিজেদের উদ্যোগে তাদের নেতা 'কায়েদে আজম জিন্নাহ'র
ওপর পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিল। সেটি বাজারে শোচনীয়ভাবে ফ্লপ
করেছে। পাকিস্তান সরকার ছবিটি নির্মাণে অর্থের কার্পণ্য করেনি। কিন্তু
ছবিটির পরিচালনা ছিল খুবই দুর্বল। জিন্নাহর ভূমিকায় বিখ্যাত অভিনেতা পিটার
লি অভিনয় করলে কী হবে, চেহারায়, পোশাকে-আশাকে তিনি জিন্নাহ হয়েছেন; কিন্তু
জিন্নাহ চরিত্রের কোনো বৈশিষ্ট্যই তিনি বুঝতে পারেননি। জিন্নাহর ছবি, তাতে
জিন্নাহ নেই, সেই ছবি কেউ দেখতে যায় কি?
লন্ডনে জিন্নাহ ছবিটি মুক্তি পেলে এক ব্রিটিশ-ক্রিটিক লিখেছিলেন, 'জিন্নাহর
চরিত্রে কোনো মহিরুহের মতো ব্যক্তিত্ব নেই। যা আছে তা চরম রূঢ়তা। কোনো
নাটকীয়তা, বৈচিত্র্য নেই। রাজনীতিতে তিনি কোনো ত্যাগ স্বীকার করেননি।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি। জেলে যাননি। দিল্লি ও বোম্বাইয়ের প্রাসাদোপম
বাড়িতে বসে কেবল কংগ্রেসকে ধমক ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তান অর্জন করেছেন।
'৪২-এর আগস্ট আন্দোলনের সময় তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থন না দিয়ে
ব্রিটিশ রাজ্যকে সমর্থন দিয়ে ভারতের কয়েকটি প্রদেশে ক্ষমতা দখল করেছিলেন।
নাটকতাবিহীন নেতা নিয়ে নাটক লেখা কষ্টকর।'
বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর জীবন এমন বৈচিত্র্য, সংগ্রাম, ত্যাগ ও নাটকীয়তাপূর্ণ
যে, তা নিয়ে গান্ধী ছবির চেয়েও ভালো চলচ্চিত্র তৈরি সম্ভব। এটা নির্ভর করে
যোগ্য স্ট্ক্রিপ্ট রাইটার, যোগ্য পরিচালক এবং শক্তিশালী অভিনেতার ওপর।
ছবিটি পরিচালনার ব্যাপারে শ্যাম বেনেগাল কতটা সফল হবেন, তা জানি না। তিনি
খুব দক্ষ ও শক্তিশালী চিত্র পরিচালক। আশা করি, তার পরিচালনায় ছবি নির্মিত
হলে ছবিটি রিচার্ড এটেনবরার 'গান্ধী' ছবির মতো সারাবিশ্বে আদৃত হবে।

তবে
সত্য কথা বলতে কি, জীবনী চিত্র নির্মাণে শ্যাম বেনেগাল কতটা দক্ষ, তা আমি
জানি না। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে তিনি 'অ্যা ফরগোটেন হিরো' নামে
একটি ছবি নির্মাণ করেছেন। ছবিটি দেখে আমি হতাশ হয়েছি। ১৯৪১ সালে কলকাতা
থেকে তার অন্তর্ধানের দৃশ্যগুলো তিনি সঠিকভাবে চিত্রিত করতে পারেননি।
ছবিটিতে কোথায় নেতাজির সেই তেজস্বিতা, সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ চরিত্র? তার
বদলে এক প্রেমকাতর, দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোদুল্যমান এক সুভাষচন্দ্রকে দেখা
গেছে। পরিচালনায় ত্রুটি ও স্ট্ক্রিপ্টের দুর্বলতা দুটিই ছবিটিতে প্রকট। ফলে
ছবিটি বাজার পায়নি।
সুভাষ বসুকে নিয়ে নির্মিত ছবির স্ট্ক্রিপ্ট, পরিচালনা, অভিনয়ে দুর্বলতাগুলো
এড়িয়ে শ্যাম বেনেগাল যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবিটিতে তার প্রকৃত চরিত্র
ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তা হলেই বিশ্ববাজারে দর্শকের কাছে ছবিটি চাঞ্চল্য
সৃষ্টি করবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন এমনই বৈচিত্র্য ও নাটকীয়তাপূর্ণ যে, তাতে
নতুন কোনো নাটক যোগ করতে হবে না। স্কটিশ স্বাধীনতার বীরকে নিয়ে তৈরি 'ব্রেভ
হিরো' ছবিটি যেমন ঘটনার বৈচিত্র্য এবং চরিত্রের তেজস্বিতার জন্য দর্শকরা
রুদ্ধশ্বাস হয়ে দেখে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার চেয়েও তেজস্বিতা, আন্দোলনের
বৈচিত্র্য, সংগ্রামের সাহসিকতা নিয়ে ছবি তৈরি হতে পারে। ছবিটি বাংলাদেশ ও
ভারতের দুই সরকারের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে। তাতে ছবিটি নির্মাণে দুই সরকারেরই
আঁতেল আমলাদের হস্তক্ষেপ এড়িয়ে এবং একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ হাতে লেখা
স্ট্ক্রিপ্ট ও বঙ্গবন্ধু চরিত্রে দক্ষ অভিনেতা নিয়ে বেনেগাল ছবিটি যদি তৈরি
করতে পারেন, তাহলে সারাবিশ্বের মানুষ ছবিটি দেখবে এবং অনুপ্রাণিত হবে। আমি
ছবিটির কমার্শিয়াল সাকসেস নিয়ে মাথা ঘামাই না।
আমাদের নন্দিত চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার খবরেও
খুশি হয়েছি। আশান্বিত হয়েছি, তানভীর মোকাম্মেলের মতো একজন দক্ষ পরিচালক
এবার শেখ মুজিবকে দক্ষতার সঙ্গে তার প্রিয় জনগণের কাছে তুলে ধরবেন। হাজারটা
বই নিয়ে যা হয়, তার চেয়ে একশ' গুণ বেশি হয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে
প্রচারকার্যে। বই পড়ে শিক্ষিতজন বঙ্গবন্ধুকে জানবেন। ছবি দেখলে
শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আমাদের মধ্যেও যে শক্তিশালী চলচ্চিত্র পরিচালক আছেন, তার প্রমাণ রেখে গেছেন
জহির রায়হান, আলমগীর কবির, তারেক মাসুদ প্রমুখ। এই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
বেঁচে আছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, তানভীর মোকাম্মেল, মোস্তফা সরয়ার
ফারুকী প্রমুখ। তারেক মাসুদ আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। সুদূর নিউইয়র্কে
গিয়েও তার ছবি আমি দেখেছি। তানভীর মোকাম্মেলের 'চিত্রা নদীর পারে', 'নদীর
নাম মধুমতী' ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর 'গেরিলা' ছবি দেখে আমার মনে
হয়েছে, বাংলাদেশে উন্নতমানের ছবি নির্মাণে আমাদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।
জাতির পিতার ওপর তার মর্যাদার উপযোগী মূল ছবি নির্মাণে জাতীয় মেধা ও
প্রতিভাকে যুক্ত করা হয়েছে কিনা, তাদের চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত কমিটিতে
সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়েছে কিনা, আমি জানি না। আশা করছি, তাদের
কমিটিগুলোতে রাখা হয়েছে এবং তারা সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণে সক্ষম হচ্ছেন বা
হবেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত কমিটিতে কিছু নাম রেখে তাদের কমিটির
সভায় না ডেকে বা তাদের পরামর্শ না নিয়ে যদি আমলারা তাদের ওপর ছড়ি ঘোরান,
তাহলে ছবি ভালো হবে না। অঢেল অর্থ ঢালা হবে, তা উদ্দেশ্য পূরণে সাহায্য
জোগাবে না।
'বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী', 'কারাগারের রোজনামচা' ইত্যাদি বই প্রকাশে
শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে বইগুলো অথেনটিক হয়েছে এবং শুধু
বাংলাদেশের অগণিত পাঠকের নয়, ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক দেশে ভালো প্রচার ও
সমাদর পেয়েছে। পাঠকদের মনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি এক নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ওপর ছবি তৈরিতেও শেখ হাসিনার এই ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা দরকার
হবে।
আরও একটি ব্যাপারের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ছবির স্ট্ক্রিপ্ট তৈরি ও ডায়ালগ
রচনায় লেখকরা এবং ছবির পরিচালনায় পরিচালক যেন লক্ষ্য রাখেন, বঙ্গবন্ধুর
নেতৃত্বে স্বাধীনতার যুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকাকে যথাযথ মর্যাদা
ও প্রাধান্য দিয়ে দেখানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য দেওয়ার জন্য আমরা
ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ আছি এবং থাকব। তাই বলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিতব্য
ছবিতে যেন এমনটা দেখানো না হয় যে, ভারতীয় সৈন্যরাই প্রধানত যুদ্ধ করে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ভারতের কোনো কোনো ছায়াছবিতে এমনটা
ইতোমধ্যেই দেখানো হয়েছে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর ওপর ছবি নির্মাণে গোড়াতেই
সাবধানতা দরকার।
গায়ে পড়ে পরামর্শ দিলাম। এ জন্য সংশ্নিষ্ট সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।
লন্ডন, ১৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২০
- বিষয় :
- কালের আয়নায়
- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
