ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

কষ্টার্জিত প্রবৃদ্ধি করোনায় ভেস্তে যাবে?

কষ্টার্জিত প্রবৃদ্ধি করোনায় ভেস্তে যাবে?
×

ড. মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২০ | ১০:৩৮ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সারাবিশ্ব এখন মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯-এর মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে এবং ব্যাপকতর আক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আরোপে বাধ্য হয়ে চলেছে। প্রায় প্রতিটি দেশ এখন পরস্পর থেকে স্ব-আরোপিত যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা প্রতিপালন করছে। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ এখন লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সেলফ কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, হোম কোয়ারেন্টাইন এবং/অথবা বাধ্যতামূলক ছুটিতে গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের বৃহদাংশও এখন গৃহবন্দি, যদিও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা জনগণকে মানাতে সরকারকে খুবই বেগ পেতে হচ্ছে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে এখনও আতঙ্কিত হওয়ার পর্যায়ে না পৌঁছালেও অর্থনীতিতে যে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হয়ে গেছে, সেটিকে আতঙ্কজনক বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৫ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় অর্থনীতিতে উন্নয়নের যে জোয়ার আমাদের অতি দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মহাসোপানে আরোহণের সুযোগ করে দেওয়ার কথা ছিল, এই চলমান বৈশ্বিক মহামারির আঘাতে ইতোমধ্যেই সে সম্ভাবনা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী এই মহামারির দাপট দ্রুত কমানোর কোনো সমাধান দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অতএব, মহামারির অর্থনৈতিক অভিঘাতও এক-দুই বছরে হয়তো স্তিমিত হবে না। করোনাভাইরাস মহামারির ছোবলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯২৯-৩৩-এর মহামন্দার চাইতেও ভয়াবহ যে আরেকটি মহামন্দায় ইতোমধ্যেই পতিত হয়েছে, তার ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও মহাবিপর্যয়কর সুনামির সৃষ্টি করবেই। সুনামি কথাটা হয়তো এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি খাটে না। কারণ, ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি যে একটা মহা-সংকোচনের গিরিখাতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে তা থেকে কোনো দেশের অর্থনীতিই মহাক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে নিষ্ফৃ্কতি পাবে না। ক্ষতির মাত্রা কমানোর প্রাণপণ প্রয়াসই মৃত্যুর মিছিল থামানোর পর সব দেশের নীতি-প্রণেতাদের অহর্নিশ সাধনায় পরিণত হবে।
ইতোমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অবশ্য তাদের প্রাক্কলনে জানিয়েছে যে, করোনা-পরবর্তী ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সামান্য কমলেও তা ৭.৮ শতাংশের মতো হতে পারে, যা পরবর্তী বছরে আবার ৮ শতাংশ অতিক্রম করবে। এত তাড়াতাড়ি এ ধরনের আশাবাদী পূর্বাভাস প্রদানের ভিত্তি কী, সেটি বোঝা গেল না! আমি নিজে এত বেশি উচ্চাশা পোষণ করতে পারছি না। আমার সন্দেহ, অর্থনীতির যে ধস এবং লাইনচ্যুতি ইতোমধ্যেই সংঘটিত হয়ে গেছে, তার ধকল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবে বিশ্নেষণ করতে পারেননি। বাংলাদেশের অর্থনীতির সব খাতই চলমান করোনাভাইরাস মহামারির ছোবলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে রপ্তানি খাতের চাহিদায় ধস, বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প খাতের উৎপাদন সংকোচন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের টিকে থাকার সংকট, জনশক্তি রপ্তানি বাজার সংকোচন ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস, প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে ধস এবং দেশে ফেরার আসন্ন হিড়িক, পর্যটন-হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ে ধস, নির্মাণ খাত ও নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদন খাতের ধস, পরিবহন ব্যবস্থার লণ্ডভণ্ড অবস্থা- এগুলো সহজে চোখে পড়াই স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষি খাত, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থা, দোকানপাট-শপিংমল-গ্রামীণ হাট-বাজারের দীর্ঘ অচলাবস্থা, ভোক্তাদের ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারের ধস, ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবাহ সংকোচন, শিক্ষা খাতসহ সেবা খাতের তছনছ অবস্থা- এগুলোর মাধ্যমেও সংকোচনের অভিঘাত অচিরেই দৃশ্যমান হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই অভিঘাতগুলোর সম্মিলিত যোগফল বর্তমান অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে কমপক্ষে ১-১.৫ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ২-৩ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক যা-ই বলুক না কেন।
প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে অর্থনীতির এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যেগুলোকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলতেই হবে। পরবর্তী সময়ে ঘোষণা করেছেন কৃষি খাতের প্রণোদনা। ২৫ এপ্রিল ছুটি শেষ হওয়ার পর তখনকার বাস্তবতার নিরিখে অদূর ভবিষ্যতে এগুলোর ফলোআপ হিসেবে আরও অনেক নতুন পদক্ষেপ আসবে নিঃসন্দেহে। পোশাক শিল্প খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, অন্যান্য রপ্তানিকারক শিল্প কারখানা- এগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজগুলো থেকে উদার সহায়তা পাবে, যা তাদের জন্য স্বস্তিকর হবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষত, দেশের রপ্তানি খাত যেহেতু আগামী এক-দুই বছর প্রচণ্ড সংকোচনের শিকার হবে, তাই ওদিকে প্রাথমিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই হবে। যাতে রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের আসন্ন ছাঁটাই ও বেকারত্ব থেকে রক্ষা করা যায়, তার জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিক পদক্ষেপ বিবেচিত হবে। দেশের চার কোটি দরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর ব্যাপারটিও প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অভিযোগ করছে। অন্যদিকে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন ও জীবিকা এই মহামারির ফলে অচিরেই আরও বেশি কঠিন বিপর্যয়ের গিরিখাতে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে, সেটিও আমাদের দৃষ্টিসীমায় রাখতেই হবে।
আশঙ্কা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে যে ধস নেমেছে, সেটি মোটেও স্বল্পমেয়াদি হবে না। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে বাংলাদেশি জনশক্তির চাহিদা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হলে লাখ লাখ প্রবাসীকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে হবে। এর ফলে শুধু রেমিট্যান্স প্রবাহে যে ধস নামবে, তা নয়। দেশের বেকারত্ব সমস্যাকেও এই চাকরি হারানো প্রবাসীরা মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতাও এর ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে শ্নথ হয়ে যাবে। দেশের রপ্তানি আয়ের সংকোচন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের সংকোচনের যুগপৎ অভিঘাতে আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি হিসাব মানে কারেন্ট অ্যাকাউন্টে বড়সড় ঘাটতি সৃষ্টি হবে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে আমাদের আমদানি-সক্ষমতায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাবনতিতে। এর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ে বড়সড় ঘাটতি সৃষ্টি হবে, যার ফলে সরকারের উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করতেই হবে। এমনকি, সরকারের পৌনঃপুনিক বা রাজস্ব ব্যয় সংস্থানেও আগামী বছর সংকট সৃষ্টি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
চলমান অনেক প্রকল্পই অর্থায়ন সংকটে স্থবির হয়ে যাবে, এটিও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাবে, মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অনেক পিছিয়ে যাবে। মোদ্দাকথা হলো, দেশের কষ্টার্জিত অর্থনৈতিক গতিশীলতা যাতে লণ্ডভণ্ড না হয়ে যায়, সে জন্য অদূর ভবিষ্যতে আরেকটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কর্মসূচিকে যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার সহকারে নীতি-প্রণেতাদের সঠিক নির্দেশনায় জাতির সর্বাত্মক মিশনে পরিণত করতে না পারলে অর্থনীতি এই গভীর গিরিখাত থেকে আবারও উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে আসা কঠিন হয়ে যাবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান মহামারির কবলে নিক্ষিপ্ত বিশ্ব অর্থনীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সংকটের গিরিখাতে পড়ার সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। এর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উত্তরণের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্শাল প্ল্যানের মতো আরেকটি পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্নির্মাণ কর্মসূচির প্রয়োজন হবে বলে মত ব্যক্ত করেছেন ইউরোপীয় বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্র পূর্ব সীমান্তের মাত্র কয়েকটি অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও যুদ্ধের প্রস্তুতির ডামাডোলে তদানীন্তন বাংলা ১৯৪৩-৪৪ সালে 'পঞ্চাশের মন্বন্তরের' কবলে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। আজকের বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে, এখন আমরা ঔপনিবেশিক বিদেশি প্রভুদের খামখেয়ালিপনার অসহায় শিকার হবো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা আমাদের নিজস্ব মার্শাল প্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংকটের গিরিখাত থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নয়নের মহাসড়কে দ্রুত ফিরতে সক্ষম হবোই ইনশাআল্লাহ, এটাই হোক আজকের প্রার্থনা।
অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি
বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×