ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

বাজেট 

তামাক কোম্পানির সুবিধা যেভাবে নারীর জন্য হুমকি

তামাক কোম্পানির সুবিধা যেভাবে নারীর জন্য হুমকি
×

ধোঁয়াবিহীন তামাকের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের দেশের নারীরা

সীমা দাস সীমু  

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৬:০২ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৫৩

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের নামমাত্র মূল্যবৃদ্ধি হতাশাজনক। তেমনি ভয়াবহ বিষয় হলো– বিড়ি, জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি রয়েছে, এবারের বাজেট প্রস্তাবনা তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

মে ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি এখন ৯.৪২ শতাংশ। এই বাস্তবতায় যখন কোনো পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়, তখন অর্থনৈতিক নিয়মে তার প্রকৃত মূল্য মূলত হ্রাস পায়। জর্দা, গুল এবং বিড়ির মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর পণ্যের মূল্য প্রস্তাবিত বাজেটে অপরিবর্তিত রাখার অর্থ হলো, মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে এগুলো আরও সস্তা এবং সহজলভ্য হয়ে উঠবে।

গ্লোবাল এডাল্ট ট্যোবাকো সার্ভের (গ্যাটস ২০১৭) তথ্যমতে, বাংলাদেশের ২০.৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন। বিড়ি বা সিগারেটের ধোঁয়া না থাকায় অনেকেই একে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর মনে করেন, যা একটি ভয়াবহ ভুল ধারণা। জর্দা এবং গুলের মধ্যে উচ্চমাত্রায় নিকোটিন, ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে। এই সস্তা ও সহজলভ্য মরণনেশাকে বাজেটের মাধ্যমে আরও উৎসাহিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ধোঁয়াবিহীন তামাকের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের দেশের নারীরা। গ্যাটসের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার যেখানে ১৬.২ শতাংশ, সেখানে নারীদের মধ্যে এই হার ২৫.৮ শতাংশ– যা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এই ধোঁয়াবিহীন তামাকের দ্বারা আমাদের দেশের নারীরা ভুক্তভোগী। তাদের গর্ভকালীন জটিলতা হয়। জর্দা-গুলের ব্যবহার নারীদের গর্ভপাত, মৃত শিশু জন্মদান এবং কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ করে দেয়।

২০১০-১১ সালের মধ্যে পরিচালিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের পেডিওট্রিকস, অবস্টেট্রিকস ও গাইনি বিভাগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, শতকরা ৪৬ ভাগ প্রিম্যাচিওর শিশুর মায়েরা গুল এবং ২১.৭৩ ভাগ শিশুর মায়েরা জর্দা খান (মুনমুন ও অন্যান্য, বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ সাময়িকী, ২০১৬)। নারীদের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। মুখের ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এবং হৃদরোগের পেছনে এই ধোঁয়াবিহীন তামাক প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়াও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বৃদ্ধি পায়। নিম্ন আয়ের ও গ্রামীণ নারীদের মধ্যে জর্দা-গুলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এই ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য গ্রহণের ফলে তারা ক্যান্সারসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এসব রোগের চিকিৎসা বাবদ অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। 

নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে উপেক্ষা করার অর্থ হলো দেশের একটি বিশাল উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া। এবারের বাজেটে জর্দা-গুলের দাম না বাড়িয়ে প্রকারান্তরে নারীদের এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিকেই চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

শুধু ধোঁয়াবিহীন তামাক নয়, সিগারেটের ক্ষেত্রেও এবারের কর প্রস্তাবনা জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ শলাকার নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৬২ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মাত্র ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি। ৯.৪২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলে নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য ৫.৬ শতাংশ কমে যাবে। উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরেও প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তটি এসেছে নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্য নিয়ে। প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের দাম ৫০০ টাকা (সম্পূরক শুল্ক ৪০%) এবং ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের দাম ২১০ টাকা (সম্পূরক শুল্ক ৬৭%) নির্ধারণ করে এগুলোকে একপ্রকার বৈধতা ও বাজার তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

যেখানে বিশ্বজুড়ে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের মতো তামাকপণ্যগুলোকে নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি উঠছে, সেখানে বাংলাদেশে কর নির্ধারণের মাধ্যমে এগুলোর বাজারজাতকরণে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো মূলত তরুণ ও কিশোর সমাজকে টার্গেট করে তৈরি করা এক ধরনের নতুন আসক্তির ফাঁদ। চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে তরুণ প্রজন্ম যদি এই নতুন নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন চিরতরে অধরা থেকে যাবে।

জর্দা এবং গুলের খুচরা মূল্য অবিলম্বে বৃদ্ধি করতে হবে এবং এর ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে, যাতে এগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সিগারেটের চার স্তরের জটিল কর কাঠামো ভেঙে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে অবিলম্বে একীভূত করতে হবে। সব স্তরেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃত মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের ওপর কর ধার্য করে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এগুলোকে দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। 

তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না, বরং এটি পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশাল বোঝা তৈরি করে। তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় প্রতিবছর যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব তার চেয়ে অনেক কম।

বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন তামাকের সহজলভ্যতা আমাদের মা ও বোন এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তামাকের বিরুদ্ধে অবস্থান সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার যে প্রত্যয় গ্রহণ করেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে হলে তামাক কোম্পানির এই সুবিধাপ্রাপ্ত বাজেট প্রস্তাবনা সংশোধন করতে হবে। জনস্বার্থকে করপোরেট মুনাফার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে একটি সুস্থ, সবল ও তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাজেটে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা এখন সময়ের দাবি।

সীমা দাস সীমু: পরিচালক উবিনীগ

আরও পড়ুন

×