কূটনীতি
সম্পর্কোন্নয়নে ভারতেরই এগিয়ে আসা উচিত
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
জু লাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলতে থাকে। উভয় পক্ষেই কারও কারও প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর সে টানাপোড়েন কমে গিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। সেই আভাসও পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রধান অনুষঙ্গ– ব্যবসা-বাণিজ্য, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত বিরোধ ও সহিংসতা, পারস্পরিক ভিসা, পর্যটন, চিকিৎসা প্রভৃতি কারণে উভয় দেশের জনগণের অস্থায়ী অভিবাসন, ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ইত্যাদি।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান এবং স্থল সীমান্ত দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের ট্রানজিট রুট বন্ধ করে দেওয়া হয়। উভয় দেশ পরস্পরের সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এমন অবনতি কখনও দেখা যায়নি। গণঅভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন, তেমনি ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপির সরকার গঠনের পর ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগী হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত হয়ে নরেন্দ্র মোদির লেখা চিঠিও হস্তান্তর করেন। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৭-৯ এপ্রিল ভারতে তিন দিনের শুভেচ্ছা সফর করেন।
গত দুই বছরে দুই দেশই ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যেমন– স্থল সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য, কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে বিমানপথে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য প্রেরণ, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে মালপত্র পরিবহনের ট্রানজিট রুট ব্যবহার ইত্যাদি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-ত্রিপুরা পণ্য পরিবহন সীমিত আকারে চালু হয়েছে। এ ছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সময় ভারত থেকে ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল।
কথায় বলে, আমরা নিজেদের বন্ধু বাছাই করতে পারি, কিন্তু প্রতিবেশী বাছাই করতে পারি না। প্রায় ৪১শ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত দুই দেশকে পৃথক করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার বছরের অভিন্ন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। উপরন্তু উভয়ের রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত স্মৃতি ও অর্জন। বাংলাদেশ-ভারত উভয়েরই একে অপরকে প্রয়োজন। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে উভয় দেশকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণে উভয় দেশকেই আন্তরিক ও মনোযোগী হতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি ভারতের একজন রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। পরিচয়পত্র দাখিলের পরপরই তিনি গত ২৫ জুন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে ভিজিট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন এবং পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে থাকা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক করিডোর পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য, উস্কানিমূলক আচরণ ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব উভয় দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তিনি শপথ নেওয়ার পর থেকেই বিএসএফ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে আটককৃত মুসলমান নারী, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ‘পুশইন’ শুরু করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সংগত কারণেই এসব প্রতিহত করে ‘পুশব্যাক’ করছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন উভয় দেশেরই অগ্রাধিকারভুক্ত বিষয়। কয়েক বছর ধরে দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন সত্ত্বেও গত বছর ভারত থেকে মোট আমদানি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, বিশেষ করে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। কিন্তু নানা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিকে ভারত সরকার নিরুৎসাহিত করছে। নতুন সরকারের অন্যতম করণীয় হবে আলাপ-আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সচল করা। প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি নবায়নে বা নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে ভারত শুষ্ক মৌসুমে ভাগীরথী-হুগলি নদী দিয়ে ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নেয়। ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে বর্তমান পানিপ্রবাহকে ভিত্তি করে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি পুরো নদীর প্রবাহকে আমলে নিয়ে পানি ভাগাভাগি করা। কারণ ফারাক্কা পয়েন্টে পানি আসার আগেই উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে শুরু করে উজানজুড়ে প্রায় ৯৭৫টি বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের এখন থেকেই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ নিয়ে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন বা নতুন চুক্তি করতে হবে।
এদিকে গত ১৩ মে একনেক পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। সরকার বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা ও যমুনা নদীর পানিপ্রবাহ সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। তবে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখে বস্তুনিষ্ঠ ফল অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। গঙ্গার মতো তিস্তার পানিও সরিয়ে নিয়ে ভারত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির কৃষি ফলন হুমকির মধ্যে ফেলেছে। ভারতের মনমোহন সরকার ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত করলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় স্বাক্ষর করতে পারেনি। এখন প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে চীন সহযোগিতা করবে বলে মনে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতকে করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং যমুনা ও পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবুও তখন বাংলাদেশের রপ্তানিতে নানা অশুল্ক বাধা এবং অসহযোগিতা ছিল। এমনকি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতের স্থল রাস্তা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতো। বর্তমানে ভিসা, পরিবহন, বাণিজ্য কিংবা পারস্পরিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে, তা ভারতকেই দূর করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ভারতই এসব বন্ধ করেছিল; বাংলাদেশ নয়।
ভারতকে মানতে হবে– জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সম্পর্কের মাত্রা বদলে গেছে। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং নয়াদিল্লির দাদাগিরি বাংলাদেশের জনসাধারণকে ভারতের প্রতি বিরূপ করে তুলেছে। বাংলাদেশেও কিছু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের ভোগান্তি সৃষ্টি করে দুই দেশের তিক্ততা বাড়িয়ে তুলছে। এসব থেকে পরিত্রাণে উভয় দেশের সরকার ও জনগণকে খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করেছে। কূটনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সহমর্মিতা ও সমঝোতার পথে চললে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি থেকে উভয় দেশই লাভবান হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উভয় দেশের অভিন্ন নীতি পারস্পরিক অংশীদারিত্বে সহায়ক হয়।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আশা করা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করবে। তবে ভারতকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির দায় বাংলাদেশের নয়; ভারতের। সে জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের উদ্যোগে দিল্লিকেই অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত
- বিষয় :
- কূটনীতি
