কৃষি
সুষম সার ব্যবহারে বিভ্রান্তি ও বিধেয়
মো. শহিদুল ইসলাম ও মো. জাহিরউদ্দীন
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের শিরোনাম রিপারপোসিং এগ্রিকালচার পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স এগ্রিফুড সিস্টেম। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা আমরা আন্তরিকভাবে মূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এই প্রতিবেদনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে স্বীকার করি। তবে প্রতিবেদনের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজন, যাতে বিভ্রান্তিকর ধারণার সৃষ্টি না হয়।
সুষম সার ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ফসলের উৎপাদনশীলতা টেকসইভাবে বজায় রাখা, সারের ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সংরক্ষণে সুষম সার প্রয়োগ অপরিহার্য। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কয়েক দশকের গবেষণার ভিত্তিতে দেশে বৈজ্ঞানিকভাবে সার সুপারিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। তাই সমস্যা বৈজ্ঞানিক সুপারিশের অভাবে নয়; বরং বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সেই সুপারিশ কৃষকের মাঠে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে বোরো ধানের ফলন ৩৩ শতাংশ, রোপা আমন ধানের ফলন ৬৫ শতাংশ এবং আলুর ফলন ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আমাদের বিবেচনায় এসব সম্ভাব্য ফলন বৃদ্ধির হিসাব বাস্তব অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের খামারি অ্যাপ, যা স্থানভিত্তিক সার সুপারিশ প্রদান করে, তার ব্যাপক মাঠ পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে সাধারণত ৫-১০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি, একই সঙ্গে সার ব্যয় হ্রাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ফলাফল দেশের বাস্তব কৃষি পরিস্থিতির সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ কৃষক অতিরিক্ত ফসফরাস, ৬০ শতাংশ অপর্যাপ্ত পটাশ এবং প্রায় ৯০ শতাংশ অপর্যাপ্ত সালফার ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, ধান চাষে নাইট্রোজেন তুলনামূলক কম এবং পেঁয়াজ ও সবজি চাষে বেশি ব্যবহার করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণ পুষ্টি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরলেও এগুলো সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ সার ব্যবহারের ধরন ফসলের প্রকার, অঞ্চল, মৃত্তিকার উর্বরতা, সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
এটিও উল্লেখযোগ্য, প্রতিবেদনের বিভিন্ন বিশ্লেষণ বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড হাউসহোল্ড সার্ভে ২০১৯ এবং সার সুপারিশ গাইড (এফআরজি) ২০১৮-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। অথচ বর্তমানে এফআরজি ২০২৪ কার্যকর এবং ২০২৩ সালে ভর্তুকিযুক্ত সারের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সার ব্যবহারের ধরন, ভর্তুকির পরিমাণ এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কিত কিছু বিশ্লেষণ বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে। অতএব, বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনকে বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে না দেখে সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার একটি ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে সর্বশেষ জাতীয় তথ্যভান্ডার, হালনাগাদ সার সুপারিশ, বর্তমান মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে।
ড. মো. শহিদুল ইসলাম: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি);
মো. জাহিরউদ্দীন: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, সাবেক ডিন, কৃষি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)
- বিষয় :
- কৃষি
