ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

সংসদের বিতর্ক এবং যুক্তিনির্ভর সমাজ

সংসদের বিতর্ক এবং যুক্তিনির্ভর সমাজ
×

সেলিম জাহান

সেলিম জাহান

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তর্ক ও বিতর্ক করতে ভালোবাসে। আমরা তুচ্ছ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে তর্ক করি এবং এমন সব বিষয় নিয়ে তর্ক করি, যা ব্যক্তিগত বা সামষ্টিকভাবে আমাদের প্রভাবিত করে। কখনও কখনও মানুষ শুধু তর্কের খাতিরেই তর্ক করে। সেটি প্রকৃত বিতর্ক নয়। বিতর্ক হলো গঠনমূলক ও অর্থবহ পারস্পরিক যোগাযোগের একটি পদ্ধতি; যেখানে মানুষ যুক্তি, নিরপেক্ষতা, যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং তথ্যের ভিত্তিতে মত ও পাল্টা মত উপস্থাপন করে। এর মূল ধারণা হলো, এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজ তার সমস্যাগুলোকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং সেগুলো সমাধানের পথ খুঁজে পেতে পারে। বিতর্কের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তীক্ষ্ণ, যৌক্তিক ও সৃজনশীল মন গড়ে তোলা।

সে প্রসঙ্গে বহুকাল আগে কৈশোরকালে আমার এক মাস্টার মশাই আমাকে বলেছিলেন, তর্ক আর বিতর্ক এক জিনিস নয়। বিতর্কে আমার উৎসাহ আছে জেনে তিনি আমাকে নানান সময়ে নানান পরামর্শ দিতেন। ‘বিতর্ক হচ্ছে বিশেষায়িত তর্ক; যেখানে কিছু বিধিবিধান আছে, কিছু নির্দেশনা আছে, সময়ের সীমারেখা আছে, যা মেনে চলতে হয়’–বলেছিলেন তিনি। ‘সুতরাং নিছক তর্ক বিতর্ক নয়, এঁড়ে তর্ক তো নয়ই’, সাবধান করে দিয়েছিলেন তিনি আমাকে। পরবর্তী জীবনে নানান সময়ে মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক করার সময়ে আমি আমার মাস্টার মশাইয়ের কথাগুলো মনে রেখেছি।

আধুনিক সময়ে বিতর্কের সূতিকাগার হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামো। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সেখানে একটি সরকারি এবং বিরোধী দল থাকে। রাষ্ট্র সম্পর্কিত নানান বিষয়ে সরকার নানান রকম প্রস্তাব পেশ করে। তারপর সে প্রস্তাবের ওপরে আলোচনা এবং বিতর্ক হয়। সরকারি দল সে প্রস্তাবের পক্ষে এবং বিরোধী দল সে প্রস্তাবের বিপক্ষে কথা বলে। উভয় পক্ষের সদস্যরা তাদের বাঁধা সময়ের মধ্যে যুক্তি, তথ্য, উপাত্ত দিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। বিতর্ক শেষে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে তা গৃহীত হয় কিংবা নাকচ হয়ে যায়। প্রথাগত বিতর্কের এটিই হচ্ছে মৌলিক খোলনলচে। ইদানীং অবশ্য নানান কাঠামো, নানান আঙ্গিকের চল হয়েছে বিতর্ক অঙ্গনে।

সামগ্রিক বিচারে বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার একটি কার্যকর ক্ষেত্র তৈরি করে। এভাবেই এটি একটি উন্নত পৃথিবী গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। যে পৃথিবী সমতা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। একটি সমতাভিত্তিক পৃথিবী মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সমঅধিকারের পক্ষে দাঁড়ায়। এর ফলে আরও কিছু বিষয় স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে–অন্য মানুষের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, ভিন্ন মত ও বিশ্বাসকে সম্মান করা, সহনশীলতা, সকল নাগরিকের সমান আচরণ নিশ্চিত করা, ধর্মনিরপেক্ষ থাকা ইত্যাদি। সমতাপূর্ণ পৃথিবীর ধারণা কোনো কল্পনা বা ফাঁকা বুলি নয়; বরং এটি এমন একটি লক্ষ্য, যা আমরা সবাই অর্জনের চেষ্টা করতে পারি। সমতা বলতে শুধু সুযোগের সমতা নয়, সক্ষমতার সমতাকেও বোঝায়। সমতার পাশাপাশি ন্যায্যতাও প্রয়োজন। সমতা একটি পরম ধারণা, কিন্তু ন্যায্যতা আপেক্ষিক বা আনুপাতিক। উদাহরণস্বরূপ, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হলেও কর প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির আয়ের অনুপাতে করের বোঝা নির্ধারণ করা উচিত।

একটি কাঙ্ক্ষিত বিশ্ব হচ্ছে একটি স্থিতিশীল পৃথিবী; যেখানে যুদ্ধ ও সংঘাত থাকবে না, মানব নিপীড়ন থাকবে না, সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থাকবে না এবং সর্বোপরি সন্ত্রাসবাদ থাকবে না। আজকের পৃথিবী যুদ্ধ, সংঘাত, অস্থিরতা ও মানব নিপীড়নে জর্জরিত, আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মতভেদ বা অন্যান্য সংঘাত মেটাতে মানুষ প্রায়ই শক্তি বা অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে উগ্রতা ও অস্ত্রনির্ভরতা বেড়েছে, ফলে যুক্তিবোধ ও সহনশীলতা পিছিয়ে পড়েছে। আমরা যখন এসব বাধা অতিক্রম করতে পারব, তখনই পৃথিবী সত্যিকার অর্থে স্থিতিশীল হবে।

একটি কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী একই সঙ্গে একটি টেকসই পৃথিবীও হবে, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সহাবস্থান থাকবে। বর্তমান প্রজন্ম যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে, কারণ তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা ও সুযোগ সংকুচিত করবে এবং প্রজন্মগত সমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মানুষ হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল থাকলেই আমরা টিকে থাকতে এবং সমৃদ্ধ হতে পারব।

এ ধরনের পৃথিবী গঠনে অর্থবহ অংশগ্রহণের জন্য বিতর্ক তরুণদের প্রস্তুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের অংশগ্রহণের জন্য বিতর্ক তরুণদের পাঁচটি স্বতন্ত্র উপায়ে প্রস্তুত করে–প্রথমত, বিতর্ক কোনো বিষয়ের ভালো-মন্দ উভয় দিক তুলে ধরে বৃহত্তর চিত্রটি স্পষ্ট করে। ফলে অংশগ্রহণকারীরা বিষয়টি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা লাভ করে, যা গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পরিবর্তিত পৃথিবীর জন্য এমন বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি খুবই প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বিতার্কিকরা যেহেতু যৌক্তিকভাবে বিষয় বিশ্লেষণের প্রশিক্ষণ পায়, তাই তারা সমাজের অগ্রাধিকারগুলোও যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে। পরিবর্তনের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও সেগুলোকে সঠিকভাবে সাজানো জরুরি। বিতর্ক তরুণদের চিন্তা ও কাজের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা ও মনোযোগী হতে সাহায্য করে। স্পষ্ট ও মনোযোগী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তা ছাড়া বিতার্কিকরা তাদের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনের সময় প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। তাদের আলোচনা তথ্যভিত্তিক হয়। পরিবর্তনের পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ছাড়া পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করা যায় না। যেহেতু তারা নিরপেক্ষভাবে তথ্য ব্যবহার করতে জানে, তাই তারা বিশ্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারে।

তৃতীয়ত, বিতর্ক মানুষকে অন্যদের প্রতি আরও সংবেদনশীল, শ্রদ্ধাশীল এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে শেখায়। যুদ্ধ, সংঘাত ও সন্ত্রাসে জর্জরিত পৃথিবীতে সংঘাত নিরসন ও সন্ত্রাস বন্ধ করতে সংবেদনশীলতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অত্যন্ত জরুরি। এসব গুণ সমতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা তৈরি করে, যা একটি উন্নত পৃথিবীর অপরিহার্য উপাদান।

চতুর্থত, বিতর্ক বিতার্কিকদের আত্মবিশ্বাস দেয়– নিজের মত প্রকাশের, উদ্বেগ তুলে ধরার এবং সমাধান দাবি ও অনুসন্ধানের আত্মবিশ্বাস। বিশ্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া বিতর্কের মাধ্যমে দলীয় সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মনোভাব গড়ে ওঠে। ফলে বিতার্কিকরা ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে যৌথ প্রচেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। 
সব শেষে, পৃথিবীর পরিবর্তন একটি স্থির প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার বদলায়, লক্ষ্য নতুনভাবে নির্ধারিত হয় এবং কৌশল পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তনকারীদের এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। বিতর্কও একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যা বিতার্কিকদের শেখায় কীভাবে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মানিয়ে নিতে হয়।
আমার মতে, বর্তমান সময়ে বিতর্ক অন্তত তিনটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারে–প্রথমত, অসহিষ্ণুতা ও সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তিবোধ, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মতপার্থক্য মীমাংসার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে; দ্বিতীয়ত, পরিবেশ দূষণ, অভিবাসন ও শরণার্থীর মতো উদীয়মান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করে; এবং তৃতীয়ত, সমাজে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

×