বিদায়েও চ্যাম্পিয়ন কেপ ভার্দে!
সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৮
তালি, ড্রামের আওয়াজ আর গাড়ির হর্নের শব্দে ফেটে পড়ল চারপাশ। শনিবার ভোরে কেপ ভার্দের রাজধানী প্রায়ার রাস্তায় এমন উদযাপনে মেতে ওঠেন দেশটির সাধারণ মানুষ। বিশ্বকাপ থেকে দেশটি বিদায় নিয়েছে; কিন্তু মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে যেভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্বে। শেষ বত্রিশে লিওনেল মেসিদের কাছে ৩-২ গোলের পরাজয়ে মাঠেই ভেঙে পড়েন খেলোয়াড়রা। তবে ভোজিনহোরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাচ্ছেন এটি নিশ্চিতভাবেই জেনে যে, তারা লাখো মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। তাই তো বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও আক্ষরিক অর্থে ফুটবলের বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন তো কেপ ভার্দেই!
কেপ ভার্দে বিদায় নিচ্ছে ঠিকই, তবে এই বিশ্বকাপ শেষে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যখন তাদের সেরা মুহূর্তগুলোর কোলাজ তৈরি করবে, তখন আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের এই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জের দলটি সেখানে বড় একটা জায়গাজুড়ে থাকবে। স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে ম্যাচে ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার ডাইভিং সেভের সেই দৃশ্য; উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র করে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম দুটি বিশ্বকাপ গোলের পর উদযাপনের সেই মুহূর্ত; কিংবা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যাওয়া ম্যাচে সিডনি লোপেস কাবরালের সেই চোখ ধাঁধানো দুর্দান্ত গোল। বিশ্বকাপ যদি কেবলই কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত দিয়ে পরিমাপ করা হতো, তবে কেপ ভার্দেই হতো চ্যাম্পিয়ন। অনেক দিক থেকেই, তারা যখন ফিরছে, তখন তাদের ঝুলিতে রয়েছে সোনালি ট্রফির চেয়েও বড় কোনো জয়।
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আক্ষরিক অর্থেই কেপ ভার্দেকে বিশ্বের মানচিত্রে এক নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। রক্ষণভাগের খেলোয়াড় পিকো লোপেস বলেন, ‘এখন আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না কেপ ভার্দে কোথায় অবস্থিত। তারা জানে আমরা কোথায় আছি।’ লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনা যদি আগে এই দল নিয়ে না জেনেও থাকেন, তবে ম্যাচের পর এখন নিশ্চিতভাবেই তা জানেন। বাংলাদেশ সময় গতকাল শনিবার সকালে ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বসার সময় আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এমনভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, যেন মনে হচ্ছিল তিনি কেবলই এক প্রচণ্ড মানসিক ধকল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ‘সবাই ভেবেছিল এটা অনেক সহজ একটা ম্যাচ (বা জয়) হতে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা জানতাম যে তা হবে না। ম্যাচটি আমাদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। আমাদের বেশ লড়াই করতে হয়েছে।’
পাঁচ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দের এই রূপকথার গল্পের পেছনের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর ভেতরের এক রহস্যময় রোমাঞ্চ। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ক্যামেরুন যখন এমন এক দল নিয়ে হাজির হয়েছিল; যাদের তেমন কেউ চিনতই না, আর তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। সেই একটিমাত্র ম্যাচের ফল ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িক এবং রজার মিলারের মতো খেলোয়াড়দের রাতারাতি সবার পরিচিত নাম বানিয়ে দিয়েছিল। কেপ ভার্দের গল্পেও ঠিক একই রকম একটা মোহনীয় জাদু আছে। যেমন ভোজিনহা, যিনি পর্তুগালের দ্বিতীয় স্তরের ফুটবলে খেলেন, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা ছিল ৫০,০০০। এখন তা প্রায় ২০ মিলিয়নের কাছাকাছি! অন্যদিকে লোপেস, যিনি তাঁর পুরো ক্যারিয়ার আয়ারল্যান্ডের লিগে কাটিয়েছেন, তাঁকে কেপ ভার্দের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পর্তুগিজ ভাষায় পাঠানো প্রথম মেসেজটি তিনি পাত্তাই দেননি। এর প্রায় ৯ মাস পর যখন ইংরেজিতে আরেকটি ফলো-আপ মেসেজ পাঠানো হয়, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে প্রস্তাবটি সত্যি ছিল।
কেপ ভার্দে তিনটি সাবেক বিশ্বকাপ জয়ী দলের বিপক্ষে খেলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে, তবে ৯০ মিনিটের মূল খেলায় তারা একটি ম্যাচও হারেনি। কোচ বুবিস্তার মতে, ম্যাচগুলো যে তারা সঠিক উপায়ে খেলেছে; সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দল নিয়ে তাই গর্বিত কেপ ভার্দের কোচ, ‘আমরা আমাদের নিজস্ব কৌশলের প্রতি অবিচল ছিলাম। পুরো টুর্নামেন্টে আমরা যা করেছি, তার জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত। খেলার চেয়েও বড় বিষয় ছিল–বিশ্বের কাছে আমাদের নিজেদের পরিচয় তুলে ধরা। ছোট দেশ হওয়া কোনো বাধা নয়। আমরা অন্যভাবেও খেলতে পারতাম, কিন্তু আমরা তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটিই আমাদের আত্মমর্যাদার বিষয়। দলের খেলোয়াড়দের এই প্রচেষ্টা এবং এতটা হৃদয় উজাড় করে খেলার জন্য আমি কেবল তাদের ধন্যবাদই জানাতে পারি। আমাদের দেশ আসলে কেমন, তারা সেটিই ফুটিয়ে তুলেছে। এই টুর্নামেন্টে তারা যা করে দেখিয়েছে, তার জন্য সবারই তাদের ধন্যবাদ জানানো উচিত।’ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিশ্চিতভাবেই তা করবেন। ৪৮ দলের বর্ধিত টুর্নামেন্ট ফরম্যাটের পক্ষে কেপ ভার্দের মতো গল্পের চেয়ে ভালো কোনো বিজ্ঞাপন আর হতেই পারে না।
আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর ড্রেসিংরুমে কেপ ভার্দের ফুটবলারদের কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল, তবে এই কান্না হয়তো বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কেপ ভার্দে বিদায় নিচ্ছে তাদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে এবং নতুন এক বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী সঙ্গে নিয়ে। ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা এবং তাঁর তরুণ সতীর্থদের অনেকেই হয়তো তাদের এই নতুন পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে এই গ্রীষ্মেই নতুন কোনো ক্লাবে দলবদল করতে পারেন। কেপ ভার্দের টুর্নামেন্ট হয়তো শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এই স্মৃতিগুলো আজীবন অম্লান থাকবে।
