অন্যদৃষ্টি
স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে অনিয়ম
রূপালী আক্তার
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তথা শিশু। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। এই উপলব্ধি থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে ‘স্কুল ফিডিং’ বা ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি। কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা, ঝরে পড়ার হার রোধ এবং দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করার লক্ষ্যে এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী, দূরদর্শী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহে পাঁচ দিন (রোববার থেকে বৃহস্পতিবার) শিশুদের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুষ্টিকর ও শুকনো খাবার বিতরণ করার নিয়ম রয়েছে। শিশুদের দৈনিক পুষ্টির চাহিদার একটি বড় অংশ নিশ্চিত করতে খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে পাঁচটি প্রধান উপাদান। এগুলো হলো–১২০ গ্রাম ওজনের পুষ্টিকর পাউরুটি, ৬০ গ্রাম ওজনের একটি সেদ্ধ ডিম, ২০০ মিলিলিটার ইউএইচটি (তরল) দুধ, ৭৫ গ্রাম ফরটিফায়েড (ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ) উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন বিস্কুট এবং ১০০ গ্রাম ওজনের মৌসুমি ফল (সাধারণত পাকা কলা)। এই সুষম খাদ্যতালিকা এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিশুদের দৈনিক ক্যালোরি ও প্রোটিনের চাহিদা মিটিয়ে তাদের মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে।
কাগজ-কলমে এই উদ্যোগ যতটা আদর্শ এবং মহৎ; মাঠ পর্যায়ের চিত্র ঠিক ততটাই উদ্বেগজনক।
দেশজুড়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যাপক গাফিলতির অভিযোগ প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের টাটকা ও মানসম্মত খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি কিংবা বিস্কুট। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে পাউরুটিতে ক্ষতিকর ছত্রাক (ফাংগাস) ও জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে।
ডিম বিতরণের ক্ষেত্রেও চলছে ব্যাপক কারচুপি। নির্ধারিত ৬০ গ্রাম ওজনের চেয়ে অনেক কম ওজনের ছোট বা নিম্নমানের ডিম দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক সময় পচা বা বাসি থাকে। মৌসুমি ফল হিসেবে শিশুদের যে পাকা কলা দেওয়ার কথা, তার পরিবর্তে অনেক জায়গায় দেওয়া হচ্ছে পুরোপুরি কাঁচা কিংবা অতিরিক্ত পাকা ও পচা কলা।
এ ধরনের ভেজাল ও মানহীন খাদ্যসামগ্রী কোমলমতি শিশুদের সুস্বাস্থ্যের পরিবর্তে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। চিকিৎসকদের মতে, ছত্রাকযুক্ত রুটি এবং পচা ডিম খাওয়ার ফলে শিশুরা ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটব্যথা ও দীর্ঘস্থায়ী হজমের সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত বা নিম্নমানের বিস্কুট শিশুদের দাঁতের ক্ষয় (ক্যারিজ) এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়, এই মহৎ কর্মসূচির জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অসাধু ঠিকাদারদের পকেটে যাচ্ছে। তদারকির অভাব ও দুর্নীতির কারণে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে।
এই জাতীয় সংকটের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রকৃত সুফল ঘরে তুলতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে খাদ্য সরবরাহ প্রক্রিয়া কঠোর ও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘তদারকি কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, খাদ্যের গুণগত মান কঠোরভাবে যাচাই না করে কোনো খাবার বিতরণ করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে হেলাফেলার কোনো সুযোগ নেই। অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই প্রশংসনীয় এ কর্মসূচিকে শতভাগ সফল করে তোলা সম্ভব।
রূপালী আক্তার: শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
