ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

বাঁধ কাটিয়া বালু পরিবহন

অবৈধ ও অবিমৃষ্যকারিতা

অবৈধ ও অবিমৃষ্যকারিতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাকৃতিক বিপর্যয় অপেক্ষা মানুষের লোভও যে কতখানি বিধ্বংসী হইয়া উঠিতে পারে, উহার জ্বলন্ত উদাহরণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীরক্ষামূলক বাঁধসমূহের বর্তমান করুণ দশা। অবৈধ মুনাফা চরিতার্থকরণের নিমিত্তে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বালু ব্যবসায়ী দেশের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রতিরক্ষামূলক বাঁধসমূহ নির্বিচারে কর্তন করিতেছে। বালু উত্তোলনের ফলে দেশে কেবল নদীভাঙনের ঝুঁকিই বাড়িতেছে না; বন্যাকালে এই সকল দুর্বল বাঁধ সুরক্ষা দিতে পারিবে না। বস্তুত মনুষ্যসৃষ্ট এই কৃত্রিম সংকট সামগ্রিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থারই সুদূরপ্রসারী ও অপূরণীয় ক্ষতি অনিবার্য করিয়া তুলিতেছে। 

শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনমতে, কুড়িগ্রামের চিলমারী অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে প্রায় সাড়ে চারশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডানতীর রক্ষা বাঁধের উপর ট্রাক ও ভারী যানবাহন চলাচলের সড়ক তৈয়ার করা হইয়াছে। প্রতিবেদনমতে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বালু ব্যবসায়ীরা এই সকল অপকর্ম চালাইয়া যাইতেছে। আশ্চর্যের বিষয়, বাঁধের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত ব্লকসমূহ উপড়াইয়া লইয়া তাহারা নিজেদের ট্রাক চলাচলের রাস্তায় প্রতিস্থাপন করিয়াছে। এই সকল দানবীয় ট্রাকের অনবরত যাতায়াতের ফলে বাঁধের বহু স্থানে ধস নামিয়াছে এবং সৃষ্টি হইয়াছে বিভিন্ন ফাটল। বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে এই রূপ অরক্ষিত বাঁধ যেই কোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হইবার যেই আশঙ্কা এলাকাবাসী করিতেছেন, উহা অমূলক নহে।

এই আত্মঘাতী প্রবণতা কেবল কুড়িগ্রামেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং সমগ্র দেশের চিত্রই কম-বেশি একরূপ। অতীতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী ও শাহজাদপুরে যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ কর্তন করিয়া বালুমহাল তৈরির হিড়িক পড়িয়াছে। সেইখানেও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া বাঁধের পাদদেশ হইতে বালু উত্তোলন এবং বাঁধ কর্তন করিয়া বালু পরিবহন পথ নির্মাণের অঘটন ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রতি বৎসর শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীতে তলাইয়া যাইতেছে। উপকূলীয় অঞ্চলেও পটুয়াখালী বা সাতক্ষীরায় কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ কর্তন করিয়া নোনাপানি প্রবেশ করাইয়া অবৈধ চিংড়ি চাষের যেই প্রথা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাও চরম অপরাধ। এতদ্ব্যতীত মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ভারী যন্ত্রের সাহায্যে বাঁধের পাদদেশ হইতে বালু উত্তোলন এবং দৌলতপুর উপজেলায় সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন স্থান হইতে মাটি কর্তন করিয়া বিক্রয়ের অভিযোগ উঠিয়াছে। কর্তনের ফলে বাঁধ যখন দুর্বল হয়, তখন নদী তাহার স্বাভাবিক গতিপথ হারায়। তীব্র স্রোত অকস্মাৎ লোকালয়ে প্রবেশ করিয়া ভূখণ্ডের ব্যাপক ক্ষয়সাধন করে। মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ ধুইয়া যায় এবং নদীভাঙনের ফলে হাজার হাজার মানুষ সর্বস্ব হারাইয়া উদ্বাস্তু হইতেছে। 

উদ্বেগের বিষয়, এই সকল অবৈধ কর্মকাণ্ড অধিকাংশ সময়ই ঘটে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাসিকার অগ্রভাগে। অনেক সময় মৌখিক বা জনপ্রদর্শনমূলক নিষেধাজ্ঞা বা নামমাত্র জরিমানা করা হইলেও প্রভাবশালী চক্রের রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির নিকট আইন যেন অসহায়। ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটিলেও এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন ঘটে না; কেবল লুটেরাদের নাম ও দল বদলায় মাত্র। 

গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নদী খননের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। যদি সরকার বাঁধ কর্তনের ন্যায় অবৈধ কার্যক্রম রোধে ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে সরকারের নদী খনন কর্মসূচির অর্থ কী? সুতরাং এই মুহূর্তে জাতীয় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইন প্রণয়ন জরুরি। কেবল জরিমানা বা সাময়িক অভিযান নহে, তাহাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গৃহীত হউক। 

আরও পড়ুন

×